নকআউট থেকে বিদায়, থামল এক কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক পথচলা
ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের এক স্বর্ণযুগের প্রতীক লুকা মদ্রিচ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২’র ম্যাচে পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলে হারের মধ্য দিয়েই জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলেছেন ৪০ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার। ম্যাচ শেষে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির ঘোষণা দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগে ভাসিয়ে দেন তিনি।
পর্তুগালের বিপক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমতায় ফেরার চেষ্টা চালিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। ইনজুরি সময়ে জোসকো জিভারদিওলের করা সমতাসূচক গোলটি বাতিল হয়ে গেলে শেষ হয়ে যায় দলটির বিশ্বকাপ অভিযান। শেষ বাঁশি বাজার পর হতাশায় হাঁটুতে হাত দিয়ে ঝুঁকে পড়েন মদ্রিচ। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকেন নিশ্চুপ, যেন দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রতিটি স্মৃতি একসঙ্গে ফিরে আসছিল।
জাতীয় দলের হয়ে মদ্রিচের পথচলা সংখ্যার বিচারে যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি প্রভাবের দিক থেকেও অনন্য। ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে তিনি খেলেছেন ২০১টি ম্যাচ, করেছেন ২৯টি গোল। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় ছিল তার নেতৃত্ব, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ দক্ষতা এবং সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে দলকে সামনে থেকে টেনে নেয়ার ক্ষমতা। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের প্রাণভোমরা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব থেকে উঠে এসে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারে পরিণত হওয়ার গল্পটি মদ্রিচকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। ২০১৮ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বেই প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। যদিও শিরোপা জেতা হয়নি, তবু পুরো আসরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জেতেন গোল্ডেন বল। একই বছর ব্যালন ডি'অর জিতে টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আধিপত্য ভেঙে দেন। এরপর ২০২২ বিশ্বকাপেও তার নেতৃত্বে সেমিফাইনালে উঠে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান অর্জন করে ক্রোয়েশিয়া।
এবারের বিশ্বকাপ ছিল মদ্রিচের পঞ্চম বিশ্বকাপ। ৪০ বছর বয়সেও দলের চারটি ম্যাচেই শুরুর একাদশে ছিলেন তিনি। শেষ ম্যাচেও বয়সকে যেন অস্বীকার করেছেন এই মিডফিল্ডার। ৬৬ বার বল স্পর্শ করেছেন, সফলভাবে তিনটি ট্যাকল করেছেন এবং দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের অর্ধে দুটি বিপজ্জনক ক্রস তুলে দিয়েছেন। শেষ ম্যাচেও তার পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, এখনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য তার রয়েছে।
মদ্রিচের বিদায়ের মুহূর্তে আবেগঘন দৃশ্যের জন্ম দেন তার সাবেক ক্লাব সতীর্থ ও পর্তুগাল অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ম্যাচ শেষে সৌজন্য বিনিময়ের সময় তিনি মদ্রিচকে জড়িয়ে ধরেন, মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন এবং দীর্ঘ সময় আলিঙ্গন করে রাখেন। পরে রোনালদো বলেন, মদ্রিচ ফুটবল ইতিহাসের একজন কিংবদন্তি। বহু বছর একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, মদ্রিচকে তিনি আগেও একাধিকবার এই কথাই বলেছেন। বিদায়ী এই মিডফিল্ডারের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভকামনাও জানান পর্তুগিজ মহাতারকা।
তবে মদ্রিচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সত্যিই এখানেই শেষ কি না, তা নিয়ে সামান্য হলেও আশার কথা শুনিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার প্রধান কোচ জ্লাতকো দালিচ। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, হয়তো এটিই মদ্রিচের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ, তবে আগামী চার বছরে কী ঘটবে, তা কেবল ঈশ্বরই জানেন। দেশে ফিরে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
দালিচ আরও বলেন, মদ্রিচ আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন। কঠিন ম্যাচেও তিনি নিজের দৃঢ়তা ও সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমন একজন ফুটবলারের বিদায় এভাবে হওয়ায় নিজের দুঃখও প্রকাশ করেন ক্রোয়েশিয়ার কোচ।
প্রতিপক্ষ শিবির থেকেও এসেছে মদ্রিচের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্টিনেজ বলেন, এত দীর্ঘ ক্যারিয়ার পার করেও মদ্রিচ এখনও এমনভাবে খেলেন, যেন তিনি একজন তরুণ ফুটবলার। তার মতে, আধুনিক ফুটবলে কৌশল, কারিগরি ও শারীরিক সামর্থ্য নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও খেলার পরিস্থিতি বুঝে মুহূর্তের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা খুব কম খেলোয়াড়েরই থাকে। আর সেই গুণের অন্যতম সেরা উদাহরণ লুকা মদ্রিচ।
ক্লাব ফুটবলেও মদ্রিচের অর্জন সমান উজ্জ্বল। ডায়নামো জাগরেব থেকে ইউরোপীয় ফুটবলে উত্থান, এরপর টটেনহ্যাম হটস্পারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সবশেষে রিয়াল মাদ্রিদে কিংবদন্তির মর্যাদা সব মিলিয়ে ২৩ মৌসুমের পেশাদার ক্যারিয়ার সাজিয়েছেন অসংখ্য ট্রফিতে। রিয়ালের জার্সিতে জিতেছেন ছয়টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও চারটি লা লিগা শিরোপা। সর্বশেষ মৌসুমে খেলেছেন এসি মিলানের হয়ে।
তবে ক্লাব ফুটবলের সাফল্যের চেয়েও জাতীয় দলের জার্সিতেই সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে লুকা মদ্রিচের নাম। ছোট্ট একটি দেশকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিতে পরিণত করার পেছনে তার অবদান অনস্বীকার্য। বিশ্বকাপের রানার্সআপ, তৃতীয় স্থান, ব্যালন ডি'অর, গোল্ডেন বল সব অর্জনের মধ্যেও তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকবে একজন অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা হিসেবে, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: