‘অফিস বন্ধের দিনেও বিবৃতি, আইসিসি আতঙ্কিত’
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে নাটক থামার যেন কোনো লক্ষণ নেই। ভারত সফরে যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেয়ার এক সপ্তাহের মাথায় এবার নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত ঘিরে।
রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয়, টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান দল অংশ নিলেও আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামবে না। পাকিস্তানের ঘোষণার পরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায় আইসিসি। তবে রোববার ছুটির দিনেও আইসিসির এমন তড়িৎ পদক্ষেপ তাদের আতঙ্কে থাকার লক্ষণ বলেই মনে করছেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য হিন্দুস্তান টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে লতিফ পাকিস্তান সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন। ৫৭ বছর বয়সী লতিফের মতে, পাকিস্তান যদি অবস্থান থেকে না সরে, তবে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট ক্রিকেটের ক্ষমতার ভারসাম্যই বদলে দিতে পারে।
পাকিস্তান সরকারের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিসির সতর্কতামূলক বিবৃতি নিয়ে লতিফ বলেন, ‘সাধারণত আইসিসি এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায় না। রোববার অফিস বন্ধ থাকার পরও যদি বিবৃতি দিতে হয়, তাহলে বোঝাই যায় আইসিসি আতঙ্কিত। এতে আইসিসির বড় ক্ষতি হবে। বিষয়টি বুঝতে হবে, পাকিস্তান এখানে বিসিসিআই বা ভারতকে আক্রমণ করেনি, সরাসরি আইসিসিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আইসিসি থেকে পাকিস্তান যে রাজস্ব পায়, তা আটার মধ্যে নুনের মতো। সবাই জানে, আইসিসিতে পাকিস্তানের তেমন কোনো মূল্য নেই।’
ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত কীভাবে দেখছেন, এই প্রশ্নে রশিদ লতিফ বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই সিদ্ধান্ত গত সপ্তাহেই নেয়া হয়েছিল। সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনভাবেই ঘোষণাটা দেরিতে দেওয়া হয়েছে। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে গেছে। বাংলাদেশের বিষয়টি আইসিসি খুব খারাপভাবে সামলেছে। এখানে দ্বিমুখী নীতি ছিল। সেই কারণেই পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা সবাই জানি, এই সিদ্ধান্ত পিসিবির নয়, এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটাই দেখার বিষয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তান আর্থিক ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, অন্য বোর্ডগুলো অনেক বেশি আয় করছে। এখানে কোনো সমতা নেই। এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের জন্য ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। ভারত নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তান সফর করে না, কিন্তু বাংলাদেশ একই কারণ দেখালে আইসিসি তা মানেনি। আইসিসির এমন হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটের উন্নতির জন্যই আইসিসিকে কাজ করতে হবে। আর রাজস্বের কথা যদি বলেন, না দিলেই বা কী? পাকিস্তান এখন যা পাচ্ছে, তা কিছুই না।’
সম্প্রচারকদের ওপর প্রভাব প্রসঙ্গে সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে সম্প্রচারকরা সরে দাঁড়াতে পারে, ফলে পুরো চাপটাই আইসিসির ওপর পড়বে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্তে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষ করে সম্প্রচারকরা। যদি এটি পিসিবির সিদ্ধান্ত হতো, তাহলে তারা ক্ষতির কথা ভাবত। এখন কী হবে, তা আইসিসিকেই ঠিক করতে হবে।’
আইসিসি কি পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত বদলাতে রাজি করাতে পারবে; এই প্রশ্নে লতিফ বলেন, ‘আলোচনা হওয়া দরকার। বাংলাদেশের ঘটনাই পুরো রাজনৈতিক চিত্র পাল্টে দিয়েছে। আগে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে ছিল, এখন পাকিস্তানের সঙ্গে। সবাইকে এক টেবিলে বসে কথা বলতে হবে। সমাধানের চেষ্টা হলে খেলাটা বাঁচানো সম্ভব। ভারত হয়তো তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু বাংলাদেশ বড় ধাক্কা খাবে। এই তিন দেশে বিপুল ক্রিকেট ভক্ত রয়েছে। ক্রিকেট টিকে আছে আমাদের কারণেই। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরে গেলে আইসিসি ও এসিসি দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
পাকিস্তানের বিপক্ষে আইসিসির নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে রশিদ লতিফ বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা দিতে চাইলে দিক। পাকিস্তান সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সব ভেবেই নিয়েছে। নিষেধাজ্ঞায় খুব একটা কিছু বদলাবে না। পাকিস্তানের যে ক্ষতি হবে, হবে; কিন্তু আইসিসির ক্ষতি তার চেয়েও বেশি হবে। আইসিসির ক্ষতি ৭৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইসিসি ইতালি, জার্মানি, নাইজেরিয়া, ব্রাজিলসহ অনেক দেশকে অর্থ সহায়তা দেয়। তখন তারা কীভাবে চলবে? এটাকে এক ধরনের ‘‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’’ বলা যায়, সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে।’
সবশেষে পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভির ভূমিকা নিয়ে রশিদ লতিফ বলেন, ‘আমি বরাবরই নকভি সাহেবের সমালোচক ছিলাম। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। আমাদের এই সিদ্ধান্তের দরকার ছিল। নকভি নিজেই সরকারের অংশ, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি উচ্চপর্যায়ে কথা বলার ক্ষমতা রাখেন। তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশ ও বিশ্ব ক্রিকেটে তিনি বড় ধরনের সমর্থন পাবেন।’
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: