স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন টিটির লিনু
বাংলাদেশের টেবিল টেনিসের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক নাম জোবেরা রহমান লিনু। প্রায় আড়াই দশক দেশের নারী টেবিল টেনিসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ খেলাধুলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। দীর্ঘ ক্রীড়া জীবন, অসংখ্য জাতীয় শিরোপা এবং টেবিল টেনিসের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্যই তাকে এ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে।
১৯৬৫ সালের ৯ জুন চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন জোবেরা রহমান লিনু। তার বাবা শেখ আবদুর রহমান ছিলেন সরকারি প্রকৌশলী এবং মা আঁখি রহমান। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে সিলেটের শাহজীবাজারে। সেখানেই বড় বোন মুনিরা মোর্শেদ হেলেনের হাত ধরে টেবিল টেনিসের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। বোনের সঙ্গে ক্লাবে যাওয়া থেকেই ধীরে ধীরে খেলাটির প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় এবং খুব অল্প বয়সেই তিনি টেবিল টেনিসকে নিজের জীবনের অংশ করে নেন।
মাত্র আট বছর বয়সে ১৯৭৩ সালে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব ওপেন টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে সবাইকে চমকে দেন লিনু। বড়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই রানারআপ হন তিনি। সে আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তার বড় বোন মুনিরা মোর্শেদ। পরের বছরও একই প্রতিযোগিতায় রানারআপ হয়ে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন লিনু।
১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন তিনি। সেবারও ফাইনালে হেরে যান বড় বোন হেলেনের কাছে। তবে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯৭৭ সালে প্রথমবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন লিনু। এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ আধিপত্যের যুগ। ১৯৭৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে নারী এককে মোট ১৬ বার শিরোপা জেতেন তিনি। একটি খেলায় এত দীর্ঘ সময় ধরে শীর্ষে থাকার ঘটনা বিরল। টেবিল টেনিসে তার এই অসাধারণ কৃতিত্ব জায়গা করে নেয় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে।
প্রায় ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে জাতীয় পর্যায়ে তিনি ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শুধু জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ নয়, বাংলাদেশ গেমসেও সফল ছিলেন তিনি। ১৯৮৮, ১৯৯২ ও ১৯৯৬ সালের বাংলাদেশ গেমসে টেবিল টেনিসে চ্যাম্পিয়ন হন লিনু। টেবিল টেনিসের পাশাপাশি অন্য খেলাতেও নিজের প্রতিভা দেখিয়েছেন তিনি। ১৯৭৮, ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে জাতীয় সাইক্লিং চ্যাম্পিয়নশিপেও শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে তার। তবে জাতীয় পর্যায়ে এত সাফল্য থাকলেও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ততটা সমৃদ্ধ হয়নি তার। এশীয় বা দক্ষিণ এশীয় পর্যায়ে বড় কোনো শিরোপা জেতা হয়নি। সে সময় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত ছিল এবং উন্নত মানের কোচিং সুবিধাও খুব একটা পাওয়া যেত না। ফলে নিজের অসাধারণ প্রতিভা ও অধ্যবসায় দিয়েই জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘ সময় আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে টেবিল টেনিসের উন্নয়নে সাংগঠনিক দায়িত্বেও যুক্ত হন লিনু। বাংলাদেশ টেবিল টেনিস ফেডারেশনের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে অ্যাডহক কমিটিতে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ২০০৫ সালে তিনি ইউনিসেফ বাংলাদেশের ক্রীড়াদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে লিনু নিউজিল্যান্ডে অবস্থান করছেন। আগামী ১৪ মার্চ দেশে ফেরার কথা রয়েছে তার। স্বাধীনতা পদক পাওয়ার খবর পেয়ে টেলিফোনে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ। লিনু বলেন, ‘মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। আমার তো দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বিশ্বাসই হচ্ছিল না সরকার আমাকে এভাবে মূল্যায়ন করবে। আজ আমার বাবার কথা খুব মনে পড়ছে। তিনি বেঁচে নেই। মা বেঁচে আছেন, ঢাকায় আছেন। তার সঙ্গে এই আনন্দটা ভাগ করে নিয়েছি। সবাইকে ধন্যবাদ।’
দীর্ঘ ক্রীড়া জীবন, অসংখ্য সাফল্য এবং দেশের টেবিল টেনিসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়েছে জোবেরা রহমান লিনুকে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তার এই অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: