ইউরোপ-আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল বয়কটের ডাক, বাস্তবতা কী বলছে
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ইউরোপের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট করেছে। এরই মধ্যে তার এই অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ বর্জনের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতা ও ফুটবল কর্মকর্তারা আওয়াজ তুলেছেন।
আরেকদিকে, ট্রাম্পকে বর্ণবাদী আচরণের জন্য অভিযুক্ত করে বয়কটের সুর উচ্চারিত হয়েছে আফ্রিকা থেকেও। যদিও দায়িত্বশীল বড় কোনো জায়গা থেকে এমন ডাক এখনো আসেনি। তাছাড়া বৈশ্বিক রাজনীতি যখন ক্রীড়াঙ্গনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, তখন এই বয়কটের ডাক কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে বয়কটের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়াও ঠিক হবে না। কারণ আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্প যদি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেন, তবে এই বয়কটের আওয়াজ আরও জোরেশোরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
জার্মানি থেকে প্রথমে বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি ওকে গ্যোটলিশ। তিনি আবার একই সঙ্গে হামবুর্গের আলোচিত ক্লাব এফসি সেন্ট পাউলির সভাপতি। হামবুর্গার মর্গেনপোস্টকে তিনি বলেছেন, ‘২০২৬ বিশ্বকাপ বর্জনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ভাবা ও আলোচনা করার জন্য সময় অবশ্যই এসে গেছে।’
গ্যোটলিশ আরও বলেন, ‘১৯৮০–এর দশকে অলিম্পিক গেমস বর্জনের পেছনে যে যুক্তিগুলো ছিল, সেগুলো কী ছিল? আমার হিসাব অনুযায়ী, তখনকার তুলনায় এখন সম্ভাব্য হুমকি আরও বড়। আমাদের এই আলোচনা করতেই হবে।’ বলে রাখা ভালো, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসনের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের বড় অংশ ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বর্জন করেছিল। এর জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় ব্লক ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক বর্জন করে।
ফিফার বিতর্কিত সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটারও বিশ্বকাপ বয়কটের পক্ষে নিজের মত জানিয়েছেন। গত সোমবার তিনি ফিফার এক সাবেক দুর্নীতিবিরোধী আইনজীবী মার্ক পিয়েথের মন্তব্যকে সমর্থন দেন। গত সপ্তাহে সুইস পত্রিকা ‘ডার বুন্ড’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পিয়েথ বলেন, ‘আমরা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি, সবকিছু বিবেচনায় নিলে সমর্থকদের জন্য একটাই পরামর্শ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে থাকুন!’
পিয়েথ আরও বলেন, ‘টেলিভিশনে দেখলেই তো আরও ভালোভাবে (বিশ্বকাপ) দেখা যাবে। আর যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর সমর্থকদের মনে রাখতে হবে, যদি তারা কর্তৃপক্ষের মনঃপূত না হন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে পরের ফ্লাইটেই তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। যদি তারা ভাগ্যবান হন।’ পিয়েথের বক্তব্য উদ্ধৃত করে ব্লাটার তার এক্স পোস্টে লেখেন, ‘আমার মনে হয়, মার্ক পিয়েথ এই বিশ্বকাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সঠিকই করেছেন।’
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান বিরোধী নেতা জুলিয়াস মালেমাও বিশ্বকাপ বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (সাফা) ও জাতীয় দলকে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। গত সপ্তাহে এক সাক্ষাৎকারে মালেমা বলেন, ‘বাফানা বাফানাকে সরে দাঁড়াতে হবে, সাফাকে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপসংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
মালেমো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনামলের তুলনা টেনে বলেন, ‘তখন যেমন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রও এখন তেমনই করছে। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কারণে অনেক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তাই আমাদেরও আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ও আমেরিকা-সংশ্লিষ্ট সবকিছু বর্জন করতে হবে।’
মালেমোর ভাষ্য, ‘আমরা চুপচাপ বসে থাকতে পারি না, যখন একজন মানুষ বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তোলে, আর সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে। এটা কাপুরুষতার নামান্তর।’
প্রায় ২০টি ইউরোপীয় ফুটবল ফেডারেশনের প্রধানরা বিশ্বকাপ বর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি, ভেনেজুয়েলায় তার প্রশাসনের পদক্ষেপ, বিভিন্ন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং অভিবাসন দমন অভিযানে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হাতে হত্যাকাণ্ড; সব মিলিয়ে তারা কিছু একটা প্রতিক্রিয়া দেখাতে চান।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে কয়েকজন আইনপ্রণেতা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকির পর ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তারা যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বকে বিশ্বকাপ বর্জনের মাধ্যমে ‘ট্রাম্পকে বিব্রত করার’ আহ্বান জানান। এরই মধ্যে নেদারল্যান্ডসে এক লাখের বেশি সমর্থক অনলাইনে একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন, যাতে জাতীয় দলকে টুর্নামেন্ট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে দেশটির ফুটবল সংস্থা রয়্যাল ডাচ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (কেএনভিবি) জানিয়েছে, আপাতত তারা সরে দাঁড়ানোর কোনো পরিকল্পনা করছে না। ডাচ গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কেএনভিবি ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ডাচ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখছে।’
কিন্তু নেদারল্যান্ডস বোর্ডের মতো করেই ভাবছে ইউরোপের বেশিরভাগ বোর্ড। তাছাড়া সম্ভাব্য বর্জনের খরচ ও পরিণতি ভালোভাবে ভাবাও দরকার। প্রথমেই ভাবা দরকার, আসলে শাস্তি পাবে কে? ট্রাম্প এমন ব্যক্তি নন যিনি বিশ্বকাপ নিয়ে এতটা মাথা ঘামান। বর্জনের হুমকিতে তার ওপরের নীতিগুলো থেকে সরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তিনি বিষয়টি উড়িয়ে দেবেন, উপেক্ষা করবেন এবং সামনে এগিয়ে যাবেন। অতএব, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকাপ বর্জনে বাস্তবিক অর্থে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। হয়তো কিছুটা বিব্রত হতে পারে। ট্রাম্পকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা অভিজাত শ্রেণিও বিশেষ ক্ষতির মুখে পড়বে না, কারণ তাদের এতে বড় কোনো স্বার্থ নেই। যেহেতু আয়ের সিংহভাগই তো ফিফার ঘরে যায়।
ফিফা অবশ্যই প্রভাবিত হবে। তবে যতটা ধারণা করা হয়, সম্ভবত ততটা নয়। সম্প্রচারস্বত্বের আয়, স্পনসরশিপের অর্থ তারা পেতেই থাকবে, আর টিকিট বিক্রি থেকেও তারা আগেভাগেই বিপুল রাজস্ব তুলে নিয়েছে। সংগঠনটির মুখে কিছুটা কালিমা লাগবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু এমন ‘সেকেলে’ ভাবনাগুলো তারা বহু আগেই পেছনে ফেলে এসেছে বলেই মনে হয়। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসবে বর্জনকারী দল ও তাদের সমর্থকদের ওপর। তারা নিজেদের দেশকে বিশ্বকাপে খেলতে বা দেখতে পারবে না। আর আরও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই অসংখ্য মানুষ, যারা টুর্নামেন্টে কাজ করতেন এবং পর্যটনের ফলে আর্থিকভাবে উপকৃত হতেন। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এটি হয়তো ছোট ব্যাপার, কিন্তু সেটি তখনই যুক্তিসংগত হবে, যদি বর্জন সত্যিই কোনো প্রভাব ফেলতে পারে।
১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালের অলিম্পিক বর্জনগুলোর কোনোটিই খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে সরে যায় ১৯৮৯ সালে। অথচ এর মধ্যে দুটি অলিম্পিক কার্যত নষ্ট হয়ে যায়। বহু অ্যাথলেট প্রতিযোগিতার সুযোগ হারান, আর যারা অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সাফল্যের পাশে লেগে আছে বড়সড় একটি বিস্ময় চিহ্ন।
বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে বর্জনের ঘটনা খুবই কম। ১৯৩৪ বিশ্বকাপে ইতালিতে যেতে অস্বীকার করেছিল তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। এর কারণ ছিল, চার বছর আগে তারা যখন প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তখন খুব কম ইউরোপীয় দেশই অংশ নিয়েছিল। ১৯৩৮ সালে ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিকে পেরুকে ঘিরে এক ঘটনার পর উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে খেলেনি। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশগুলো বর্জন করেছিল, কারণ তাদের মহাদেশকে সীমিত সুযোগ দেয়া হয়েছিল। আর ১৯৭৪ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে উৎখাতের পর চিলির বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানায় সোভিয়েত ইউনিয়ন।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা ও দ্য অ্যাথলেটিক।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: