[email protected] শুক্রবার, ৫ই জুন ২০২৬
২১শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

অস্ট্রেলিয়ার হোটেল থেকে যেভাবে পালান ৫ ইরানি নারী ফুটবলার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০২৬ ১৫:০৩ পিএম

গত সোমবার অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টের একটি বিলাসবহুল হোটেলের লবিতে তিন নারী ফুটবলারকে দেখা যায় কালো হিজাব ও দলের ধূসর জার্সি পরা অবস্থায়। তাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন স্থানীয় ইরানি বংশোদ্ভূত কয়েকজন অস্ট্রেলীয়।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল খুব সাধারণ আড্ডা, হাসাহাসি আর খোশগল্পে মেতে আছেন তারা। কিন্তু এই দৃশ্যটিই ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত মুহূর্ত, যার মাধ্যমে ইরানি নারী ফুটবল দলের পাঁচ সদস্য শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন।

টুর্নামেন্ট চলাকালীন গুঞ্জন ছিল, ২৬ সদস্যের এই দলের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি নেই এবং বাইরের কারো সাথে কথা বলা নিষেধ। তবে সোমবার বিকেলে হোটেলের লবিতে যখন খেলোয়াড়দের স্থানীয় কমিউনিটির মানুষের সাথে এত সহজভাবে কথা বলতে দেখা গেল, তখন প্রশ্ন উঠল—তাদের তদারককারীরা (মাইন্ডার) কোথায়?

আসলে এই পলায়নের বীজ বপন হয়েছিল গত সপ্তাহে, যখন প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীত না গাওয়ার কারণে ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই খেলোয়াড়দের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী দুই ম্যাচে তাদের সংগীত গাইতে দেখা গেলেও বোঝা যাচ্ছিল, তারা প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে আছেন।

সোমবার ঠিক যখন সূর্যাস্ত হচ্ছিল এবং দল সম্ভবত রমজানের ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই ঘটে সেই কাঙ্ক্ষিত ঘটনা। হোটেলের লবির স্বয়ংক্রিয় দরজা দিয়ে খেলোয়াড়রা অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পুলিশের উপস্থিতিতেই বাইরে বেরিয়ে যান।

এর আধা ঘণ্টা পর টনক নড়ে ইরানি প্রতিনিধিদের। কোচ মারজিয়েহ জাফারি এবং অন্য দুই কর্মকর্তাকে হন্তদন্ত হয়ে হোটেলের বেজমেন্টের দিকে ছুটতে দেখা যায়।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফাতিমেহ পাসান্দিদেহ, জহরা ঘানবারি, জহরা সারবালি, আতেফেহ রামজানজাদেহ এবং মোনা হামৌদি তখন নিরাপদ আশ্রয়ে।
এই পলায়ন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। কুইন্সল্যান্ডের ইরানি হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট হেসাম ওরুজি বিবিসি-কে জানান, তারা স্টেডিয়ামে খেলোয়াড়দের নাম ধরে স্লোগান দিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তারা অস্ট্রেলিয়ায় থেকে গেলে পূর্ণ সমর্থন পাবেন।

পলায়নের আগে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মেলোডি নাগমে দানাই হোটেলের একটি কক্ষে খেলোয়াড়দের সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করেন।

তিনি তাদের অভিবাসন আইন বুঝিয়ে বলেন। খেলোয়াড়রা তখন প্রচণ্ড চাপে ছিলেন; তারা ভাবছিলেন ইরানে ফেলে আসা পরিবার এবং সহায়-সম্পত্তির কথা। অন্যদিকে, তেহরান থেকে তাদের ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছিল যে, আশ্রয় চাইলে তাদের সরাসরি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হবে।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন মন্ত্রী টনি বার্ক মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ খেলোয়াড়ের মানবিক ভিসা অনুমোদন করেন। নাটকীয়তা আরও বাড়ে মঙ্গলবার রাতে সিডনি বিমানবন্দরে। যখন দলের বাকি সদস্যরা বিমানে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন পুলিশি পাহারায় তাদের প্রতিটি সদস্যকে আলাদাভাবে দোভাষীর মাধ্যমে আবারও আশ্রয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

টনি বার্ক জানান, ‘আমরা নিশ্চিত করেছি যেন কেউ কোনো চাপের মুখে না পড়ে। তাদের পরিবারে ফোন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।’ যদিও একজন খেলোয়াড় (মোহদ্দেসে জোলফি) এবং একজন স্টাফ প্রথমে থেকে যেতে চাইলেও পরে জোলফি মত পরিবর্তন করেন এবং ইরানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

শেষ পর্যন্ত দলের বাকি সদস্যরা কুয়ালালামপুর হয়ে ইরানের পথে রওনা হয়েছেন। পেছনে ফেলে গেছেন সেই সতীর্থদের, যাদের সাথে হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না। যারা ফিরে গেছেন, তাদের ওপর কী ধরনের শাস্তির খড়গ নেমে আসবে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আর যারা অস্ট্রেলিয়ায় থেকে গেলেন, তাদের জন্য শুরু হলো এক নতুন জীবনের লড়াই।

 

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর