আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ মরুভূমির দেশ মৌরিতানিয়া, চিনে নিন সাহারা মরুভুমির এই দেশটাকে
বিশ্বকাপে কখনও খেলা হয়নি, মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে মাত্র তিনবার— আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে সর্বোচ্চ রাউন্ড অব সিক্সটিনে খেলেছে দলটি। প্রথমবার আফকনে খেলার সুযোগ মিলে ২০১৯ সালে।
এছাড়া ফিফা আরব কাপে অংশ নিয়েছিল দুবার, কোনোবারই গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে অবশ্য নতুন নয়। তবে এখনও ফুটবল বিশ্বে খুব একটা পরিচিতি পায়নি, অনেকেই হয়তো এবারই প্রথমবার শুনছেন মৌরিতানিয়ার নাম— তাও আবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে নামবে বলে।
ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলে পথচলা শুরু করে মৌরিতানিয়া। ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো মাঠে নামে মৌরিতানিয়া জাতীয় দল, যেখানে কঙ্গোর বিপক্ষে ৬-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারে দলটি। এরপর ১৯৭০ সালে ফিফার সদস্যপদ লাভ করে, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারেনি তারা। আগামী ২৮ মার্চ ভোরে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে মৌরিতানিয়া।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মঞ্চে মৌরিতানিয়া প্রথম পা রাখে ১৯৭৮ আসরকে সামনে রেখে। কাকতালীয়ভাবে সেই টুর্নামেন্টেই নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। তবে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত ১৩টি বাছাইপর্বে অংশ নিয়েও মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি মৌরিতানিয়া।
২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়েও খুব একটা ছাপ রাখতে পারেনি মরুভূমির দলটি। ছয় দলের ‘বি’ গ্রুপে পঞ্চম হয়ে বিদায় নেয় তারা। পুরো বাছাইয়ে এক জয়ের সঙ্গে চারটি ড্র আর পাঁচটি হার— এই ছিল তাদের পরিসংখ্যান। বর্তমানে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১১৫তম স্থানে থাকা দলটির সর্বোচ্চ সাফল্য ২০১৭ সালে, র্যাঙ্কিংয়ে সেবার ৮১ নম্বরে উঠে এসেছিল তারা।
অন্যদিকে র্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে থাকা আর্জেন্টিনার সঙ্গে এই ব্যবধান এতটাই বড় যে, দুই দলের মুখোমুখি লড়াইকে ‘ডেভিড বনাম গোলিয়াথ’ বললেও হয়তো পুরো চিত্রটা ধরা পড়ে না।
ঐতিহাসিক শহর চিনগুয়েত্তি— যা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে, সেই শহরের নামেই মৌরিতানিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের নাম ‘লায়নস অব চিনগুয়েত্তি’। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া বহন করা এই নামটি দলটির সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হয়।
আফ্রিকার সেরা দলগুলোর প্রতিযোগিতা আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে এখন পর্যন্ত তিনবার (২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩) অংশ নিয়েছে মৌরিতানিয়া। তবে সর্বশেষ আসরে জায়গা করে নিতে পারেনি তারা, যা দলটির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের প্রতিফলন।
দলের বর্তমান কোচ আরতিজ লোপেজ গারাই— যার জন্ম স্পেনের বাস্ক প্রদেশের বিসকে অঞ্চলে। ২০২৪ সালে মৌরিতানিয়া জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন তিনি।
এবারের ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতিতে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে মৌরিতানিয়া। ২৮ মার্চ আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার পর ৩১ মার্চ মরক্কোতে আরেকটি প্রীতি ম্যাচে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। এই দুই ম্যাচ সামনে রেখে কোচ আরতিজ ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা করেছেন, যেখানে অর্ধেকেরও বেশি— ১৩ জন খেলোয়াড় ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেন।
তবে ইউরোপে খেললেও শীর্ষ পর্যায়ের কোনো ক্লাবে খেলেন না তাদের কেউই। তুলনামূলক পরিচিতদের মধ্যে রয়েছেন গ্রিসের ক্লাব এইকে এথেন্স-এ খেলা আবুবকরি কইতা এবং স্কটল্যান্ডের ক্লাব রেঞ্জার্স-এর ফুটবলার জেইদি গাসামা। জাতীয় দলে বর্তমানে গাসামাই সবচেয়ে দামি খেলোয়াড়, ট্রান্সফারমার্কেট অনুযায়ী তার বর্তমান বাজার মূল্য ৭০ লাখ ইউরো।
অন্যদিকে, দলে নতুন সংযোজন হিসেবে নজর কাড়ছেন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার জর্ডান লেফোর্ট। ফ্রান্সে জন্ম হলেও তার স্ত্রী সানা ফরাসি-মৌরিতানিয়ান বংশোদ্ভূত, সেই সূত্রেই জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এই আন্তর্জাতিক বিরতিতেই মৌরিতানিয়ার জার্সিতে অভিষেক হওয়ার কথা লেফোর্টের।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই ম্যাচ নিয়ে মৌরিতানিয়ার কোচ আরতিজ বলেছেন, ‘আমরা আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ। কিছুদিন হলো ফুটবলে একটু এগোতে পেরেছি। (মৌরিতানিয়ার) মানচিত্রে তাকালে আপনি শহর ও ফুটবল মাঠের চেয়ে মরুভূমি বেশি দেখতে পাবেন। আমরা নিজেদের খেলার মান আরও ভালো করার চেষ্টা করছি। আর এই (আর্জেন্টিনা) প্রীতি ম্যাচটি খেলতে পারা আমাদের জন্য সম্মানের ব্যাপার।’
টিওয়াইসি স্পোর্টসকেও আরতিজ বলেছেন, ‘এটা অনেক বড় ব্যাপার। দেশটি ফুটবলপাগল। আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে দেখা তাদের জন্য বিশাল এক ধাক্কা। খেলোয়াড়েরাও খুব রোমাঞ্চিত। দিনটি অবিস্মরণীয় হতে যাচ্ছে।’
উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে অবস্থিত ইসলামিক রিপাবলিক অব মৌরিতানিয়া— প্রায় ১০ লাখ ৩০ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এক বৈচিত্র্যময় দেশ। ভৌগোলিকভাবে এর বিশালতা যেমন চোখে পড়ার মতো, তেমনি প্রকৃতিও এখানে বেশ কঠোর। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চল সাহারা মরুভূমির বালুচরে আচ্ছাদিত— ফলে বিশ্বের সবচেয়ে কম বনভূমি থাকা দেশগুলোর একটি মৌরিতানিয়া।
দেশটির জনবসতি মূলত নাতিশীতোষ্ণ দক্ষিণ অঞ্চল এবং আটলান্টিক মহাসাগরের তীরঘেঁষা রাজধানী নুয়াকশটে। ভৌগোলিকভাবে দেশটি একদিকে আরব বিশ্বের সীমানায়, অন্যদিকে সাহারা-সংলগ্ন আফ্রিকার সঙ্গে সংযুক্ত।
মৌরিতানিয়া বিশ্বের অল্প কয়েকটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের একটি। এখানে সুন্নি ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম এবং আরবি জাতীয় ভাষা হলেও প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ফরাসির ব্যবহার এখনও ব্যাপক।
সমাজ কাঠামোতেও অতীতের যাযাবর ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট। শক্তিশালী গোত্রভিত্তিক ব্যবস্থার পাশাপাশি এখনও দেশটির প্রায় উল্লেখযোগসংখ্যক মানুষ যাযাবর জীবনধারা অনুসরণ করে। ধারণা করা হয়, প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ উটে চড়ে মরুভূমির পথে ঘুরে বেড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।
মৌরিতানিয়ার ইতিহাস ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। দীর্ঘ সংগ্রাম ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পর ১৯৬০ সালের ২৮ নভেম্বর দেশটি ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। তবে স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সহজে আসেনি; একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান দেশটির শাসনব্যবস্থাকে বারবার নাড়িয়ে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মৌরিতানিয়া।
সামাজিক ইতিহাসের দিক থেকেও দেশটি বিশেষভাবে আলোচিত। ১৯৮১ সালে মৌরিতানিয়া বিশ্বের সর্বশেষ দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে। যদিও এই প্রথার শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত ছিল, তা পুরোপুরি নির্মূল করতে বর্তমানে কঠোর আইন ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির সরকার।
প্রতিকূল জলবায়ু সত্ত্বেও প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে মৌরিতানিয়া যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। বিশেষ করে এর সমুদ্রসীমা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদে ভরপুর, যা দেশের সরকারি আয়ের একটি বড় অংশ, প্রায় ২৫ শতাংশ জোগান দেয়। পাশাপাশি লোহা ও সোনা রপ্তানিতেও দেশটির অবস্থান উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে উপকূলীয় অঞ্চলে বিশাল গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়ায় জ্বালানি খাতেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ফুটবল বিশ্বে মৌরিতানিয়া অনেকের কাছেই অপরিচিত, তবে লিওনেল স্কালোনি এই দলটার সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে মৌরিতানিয়া অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ ছিলেন লিওনেল স্কালোনি। ২০১৮ সালের ২ আগস্ট স্পেনের লা আলকুদিয়া টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচ হিসেবে অভিষেক তার তার। সেই অভিষেক ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ছিল মৌরিতানিয়া।
দারুণ শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে ওই ম্যাচে ২-০ গোলের জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। শুধু তাই নয়, স্কালোনির নেতৃত্বে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে শেষ পর্যন্ত শিরোপাও জিতে নেয় আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২০ দল। কোচ হিসেবে তার ক্যারিয়ারের শুরুতেই এটি ছিল বড় একটি সাফল্য।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: