এই ‘সেভেন আপে’ কুরাসাওয়ের গল্পে নেই সেই লজ্জা...
২০১৪ সালের মারাকানার সেই রাত। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল জার্মানি। ফুটবল ইতিহাসে যেটি পরে ‘মারাকানাজ্জো’র নতুন সংস্করণ হিসেবে জায়গা করে নেয়। সেই এক ফলাফল থেকেই ‘সেভেন আপ’ শব্দটা ফুটবলে এক ধরনের ব্যঙ্গ, বিস্ময় আর বড় ব্যবধানের প্রতীক হয়ে গেছে।
এক দশক পেরিয়ে এবার আবারও সেই ৭-১ স্কোরলাইন। তবে প্রতিপক্ষ ভিন্ন, প্রেক্ষাপটও আলাদা। এবারের বিশ্বমঞ্চে পাওয়ার ফুটবলের দেশ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল নবাগত কুরাসাও। ম্যাচের ফলাফলও সেই একই পরিচিত সংখ্যা ৭-১ ব্যবধানে জার্মানির জয়।
স্কোরবোর্ডে মিল থাকলেও গল্পের ভেতরটা একেবারেই আলাদা। ব্রাজিলের বিপক্ষে ২০১৪ সালের সেই হার ছিল এক ফুটবল পরাশক্তির ভেঙে পড়ার প্রতিচ্ছবি। আর কুরাসাওয়ের ক্ষেত্রে এই হার যেন ছোট একটি দেশের বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকার সাহসী অধ্যায়।
ম্যাচের শুরু থেকেই জার্মানি নিজেদের আধিপত্য স্পষ্ট করে তোলে। একের পর এক আক্রমণে চাপ বাড়ে কুরাসাওয়ের রক্ষণে। ব্যবধান বাড়তে থাকে দ্রুতই। কাগজে-কলমে ম্যাচটি একতরফা হয়ে উঠলেও কুরাসাও পুরো সময় জুড়েই লড়াইয়ের চেষ্টা চালিয়ে গেছে।
তবু এই ম্যাচের সবচেয়ে আলোচ্য দৃশ্য শুধু গোল নয়, শুধু ফলাফলও নয় ছিল গ্যালারি। গোল খাওয়ার পরও কুরাসাওয়ের সমর্থকেরা থেমে যাননি। তারা পতাকা উড়িয়েছেন, গান গেয়েছেন, হাততালি দিয়ে নিজেদের দলের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। হারতে থাকা দলের জন্যও তাদের সমর্থনে কোনো ভাঁজ পড়েনি।
এই মানসিকতাই কুরাসাওকে আলাদা করে দিয়েছে আগের ‘সেভেন আপ’ অভিজ্ঞতা থেকে। ব্রাজিলের ৭-১ ছিল চাপা নীরবতা, ধস নেমে আসার গল্প। আর কুরাসাওয়ের ৭-১ হলো ছোট্ট একটি দেশের বড় স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকার গল্প।
দলের অনেক ফুটবলারের শিকড় ইউরোপ, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসে। কারও জন্ম, কারও বেড়ে ওঠা সব মিলিয়ে কুরাসাও দলটা কেবল একটি দ্বীপের প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের এক পুনর্মিলনও বটে। সেই পরিচয় নিয়েই তারা বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে জায়গা করে নিচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, কুরাসাও শুধু গোল খায়নি তারা গোলও করেছে। জার্মানির মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একটি গোলও তাদের জন্য বড় অর্জনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সুযোগ তৈরি করা, আক্রমণে যাওয়া সব মিলিয়ে তারা পুরো ম্যাচে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে।
শেষ বাঁশি বাজার সময় স্কোরলাইন ৭-১ হলেও কুরাসাওয়ের গল্প থেমে থাকেনি সেই সংখ্যায়। তাদের সমর্থকেরা তখনও গ্যালারিতে, দলের পাশে। যেন ফলাফল নয়, বরং অংশগ্রহণটাই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ফুটবলে বড় ব্যবধানের হার সবসময় একই অর্থ বহন করে না। কখনো তা ভেঙে পড়ার গল্প, আবার কখনো তা সাহস করে দাঁড়িয়ে থাকার গল্প। কুরাসাওয়ের এই ৭-১ দ্বিতীয়টিরই উদাহরণ হয়ে থাকবে যেখানে পরাজয়ের মধ্যেও ছিল উপস্থিতি, পরিচয় আর বড় স্বপ্নের উচ্চারণ।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: