বাংলাদেশের হকি আরও এগিয়ে যাবে: সিগফ্রিড আইকম্যান
বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২১ হকি বিশ্বকাপে অভিষেক ছিল দেশের হকির জন্য একটি দারুন মুহূর্ত। দলটি কেবল বিশ্বমঞ্চে উপস্থিত হয়নি - তারা অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে রোমাঞ্চকর ৫-৪ জয়ের সাথে চ্যালেঞ্জার্স ট্রফিও জিতেছে। তাদের নির্ভীক দৌড়, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো পাওয়ারহাউসকে চ্যালেঞ্জ করে, বিশ্বাস, শৃঙ্খলা এবং কৌশলগত বৃদ্ধির একটি নতুন যুগের ইঙ্গিত দেয়। এটা বিশ^াস করেন দলের ডাচ কোচ সিগফ্রিড আইকম্যানও
প্রশ্ন: জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে দলের পরিচিতি বা আইডেন্টিটি যদি এক শব্দে বা বাক্যে প্রকাশ করতে বলা হয়, তবে সেটা কী হবে?
সিগফ্রিড আইকম্যান: দলটিকে আমি এক কথায় ‘একদল বন্ধু’ বলব। তারা ‘দল’ শব্দের আসল অর্থটা বুঝেছিল-‘সবাই মিলে বেশি অর্জন করা’। তারা একে অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে এবং পরিশ্রম করতে প্রস্তুত ছিল।
প্রশ্ন: চার মাসের ক্যাম্পের শুরু থেকে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচ পর্যন্ত- খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বড় কোন পরিবর্তনটি আপনার চোখে পড়েছে?
আইকম্যান: সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, খেলোয়াড়রা এটা বুঝতে শিখেছে যে, দলের কৌশল ও টেকনিক্যাল বিষয়গুলো মাঠে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল থাকাটা কতটা জরুরি।
প্রশ্ন: টুর্নামেন্টের এমন কোনো মুহূর্ত কি ছিল, যখন আপনার মনে হয়েছে এই দলটি শুধু অংশ নিতে আসেনি, বরং তারা বিশ্বমঞ্চে লড়াই করতে প্রস্তুত?
আইকম্যান: টুর্নামেন্টের একদম প্রথম ম্যাচেই, যখন দেখলাম তারা দেশের জন্য খেলতে কতটা মরিয়া। তাছাড়া টুর্নামেন্টের আগে যখন তারা নিজেদের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন তারা আমাকে কথা দিয়েছিল- আলোচনার ফলাফল যা-ই হোক, তারা মাঠে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দেবে। কারণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করাটাই ছিল তাদের স্বপ্ন।
প্রশ্ন: বিশ্বকাপের আগে চার মাসের ক্যাম্পটি ছিল নজিরবিহীন। বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের হকির আরও কী কী প্রয়োজন?
আইকম্যান: এই ক্যাম্প প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের যদি বেসিক স্কিল বা মৌলিক দক্ষতার শক্ত ভিত্তি গড়ে দেওয়া যায় এবং তারা যদি সেই দক্ষতা কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে শেখে, তবে তারা অনেক ভালো কিছু করতে সক্ষম। তবে এর জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন সুশিক্ষিত কোচ। এমন কোচ দরকার যাদের ৬টি এফআইএইচ (ঋওঐ) কোচিং কোর্সের সনদ আছে। বর্তমানে এখানকার অধিকাংশ কোচের কেবল লেভেল-২ সনদ আছে, তাও অনেক পুরনো। বিশ্ব হকি প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে, তাই কোচদেরও আধুনিক ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
প্রশ্ন: সেরা ১০টি হকি খেলুড়ে দেশের সাথে ধারাবাহিকভাবে টেক্কা দেওয়ার জায়গা থেকে বাংলাদেশ ঠিক কতটুকু দূরে? সেখানে পৌঁছানোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় শর্ত কী?
আইকম্যান: বাংলাদেশ লক্ষ্যের খুব কাছে এসেও আসলে অনেকটা দূরে। তাদের কোচিং কাঠামো বদলাতে হবে এবং কোচিং হতে হবে ‘খেলোয়াড়-কেন্দ্রিক’। খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ গতিতে খেলার যোগ্য করে তুলতে হবে। তাদের খেলা বুঝতে শেখাতে হবে, যাতে তারা মাঠে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর সবচেয়ে জরুরি হলো ফিটনেস- খেলোয়াড়দের অবশ্যই ‘হকি-ফিট’ হতে হবে, যাতে তারা পুরো ম্যাচে বারবার দ্রুত দৌড়ানোর ধকল নিতে পারে।
প্রশ্ন: খেলোয়াড়রা নিয়মিত লিগ এবং বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। একজন কোচের দৃষ্টিকোণ থেকে, দলের উন্নয়নের জন্য এটি কতটা জরুরি?
আইকম্যান: উন্নতির জন্য খেলোয়াড়দের সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশে খেলতে হবে। আমার মতে, হকি শেখার কয়েকটি ধাপ আছে। প্রথমটি হলো ভিত্তি বা বেসিক শেখা। আমি যখন আসি, তখন দেখলাম এখানকার ভিত্তিটা বেশ দুর্বল। পরের ধাপ হলো ‘খেলার জন্য খেলা’, যেখানে হার-জিত মুখ্য নয়। এরপর আসে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য খেলা’-যেখানে লিগ হয়, হারলে মন খারাপ হয়, জিতলে আনন্দ হয়। বাংলাদেশ এখন এই পর্যায়ে আছে। কিন্তু বিশ্বসেরাদের সাথে লড়তে হলে তাদের শিখতে হবে ‘জেতার জন্য খেলা’। এর মানে হলো, জয়ের জন্য টেকনিক্যাল, ট্যাকটিক্যাল ও মানসিকভাবে শতভাগ সুশৃঙ্খল থাকা। অজুহাত না দিয়ে নিজেদের পারফরম্যান্সের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে। আমাদের সবার একটি ‘উন্নতিমুখী মানসিকতা’ প্রয়োজন।
প্রশ্ন: ফিটনেস, কৌশল, গেম ম্যানেজমেন্ট বা মানসিক দৃঢ়তা- কোনটিতে উন্নতির সুযোগ সবচেয়ে বেশি বলে আপনি মনে করেন?
আইকম্যান: সেরাদের সাথে খেললে তাদের কাছ থেকে শেখা যায়। আপনি যদি কাউকে সমুদ্র পাড়ি দেওয়াতে চান, তবে তাকে শুধু নৌকা বা সরঞ্জাম দেবেন না, বরং তার মনে সমুদ্র জয়ের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলুন; তারা নিজেরাই পথ খুঁজে নেবে। উন্নতির সবচেয়ে বড় জায়গা হলো একটি ‘হাই পারফরম্যান্স কালচার’ বা উচ্চমানসম্পন্ন সংস্কৃতি গড়ে তোলা। যেখানে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে, কেউ নিজেকে ভুক্তভোগী ভাববে না।
প্রশ্ন: আমিরুল ইসলাম ছয় ম্যাচে পাঁচটি হ্যাটট্রিক করেছেন। তাকে নিয়ে আপনি বিশেষভাবে কী কাজ করেছিলেন?
আইকম্যান: আমরা তার আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কাজ করেছি এবং পেনাল্টি কর্নারে তার ড্র্যাগ বা শটগুলো কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় তা দেখিয়েছি। প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক ও রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা কীভাবে মুভ করে, আমরা সেই বিশ্লেষণ তাকে দিয়েছি। আমিরুল সেটা মেনে নিয়ে মাঠে সুশৃঙ্খলভাবে প্রয়োগ করেছে। তবে পুরো কৃতিত্ব শুধু তার একার নয়। পেনাল্টি কর্নারের সময় ইনজেক্টর, স্টপার ও ফ্লিকারের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া ছিল। তাছাড়া আক্রমণভাগের অন্য খেলোয়াড়রা, যেমন রকি, আমিরুলের জন্য প্রচুর পেনাল্টি কর্নার ও স্ট্রোক আদায় করে দিয়েছে।
প্রশ্ন: এই টুর্নামেন্টে আপনার আক্রমণভাগের কোন কৌশলটি সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে?
আইকম্যান: পাসিং গেম খেলা এবং আক্রমণে ‘২ বনাম ১’ পরিস্থিতি তৈরি করে গতি বাড়ানো। আমাদের লক্ষ্য ছিল বল পায়ে রেখে অ্যাসিস্ট, পেনাল্টি কর্নার বা গোল আদায় করা। আমিরুল ফিল্ড গোল না পেলেও আমরা প্রমাণ করেছি যে পেনাল্টি কর্নার বা স্ট্রোকের মাধ্যমেও গোল বের করা সম্ভব।
প্রশ্ন: এই ক্যাম্পেইন বাংলাদেশের হকির জন্য আসলে কী অর্থ বহন করে? উদযাপনের বাইরে গিয়ে এটি নতুন কী সম্ভাবনার দ্বার খোলে?
আইকম্যান: আমি আশা করি, এই জয় (জুনিয়র বিশ্বকাপে চ্যালেঞ্জার্স ট্রফি) হকিপ্রেমীদের মনে দাগ কাটবে এবং তারা হকির উন্নয়নের জন্য একযোগে কাজ করবে। শুধু বড় বড় কথা না বলে তাদের সমর্থন প্রয়োজন। ঘরোয়া লিগ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ চালু করতে হবে, যেখানে বিদেশি খেলোয়াড় ও আম্পায়ার থাকবেন। আমাদের ক্যাম্পে লাকি এবং শাহবাজপ্রতিদিন আম্পায়ারিং করতে আসতেন, যাতে আমরা কড়া আম্পায়ারিংয়ের সাথে অভ্যস্ত হতে পারি। এর ফলে শেষ দুই ম্যাচে আমরা কোনো কার্ড দেখিনি। আমাদের সাধারণ সম্পাদক সাধ্যমতো সব করেছেন। আমাদের হয়তো টাকার অভাব থাকতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল হলে এবং বিকল্প পথ খুঁজলে কম টাকাতেও অনেক কিছু করা সম্ভব। চ্যালেঞ্জ থাকলে খুব শিগগিরই শীর্ষ ১০ এর ম্েযধ চলে আসবে বাংলাদেশের হকি।
প্রশ্ন: পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে বাংলাদেশ শারীরিকভাবে শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে দুর্দান্ত রক্ষণাত্মক খেলা উপহার দিয়েছে। এর পেছনের রহস্য কী ছিল?
আইকম্যান: মালয়েশিয়ায় প্রথম টেস্ট ম্যাচে আমরা রক্ষণে অনেক ভুল করেছিলাম, কিন্তু ধীরে ধীরে সেগুলো শুধরে নিয়েছি। আমরা রক্ষণভাগে সরাসরি ট্যাকল বা কেড়াকাড়ি কমিয়ে প্রতিপক্ষকে আটকে রাখার (ফবষধু) কৌশল নিয়েছি। এতে আমাদের ডিফেন্সে খেলোয়াড় সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিনিয়র দল এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায়নি, তাই তাদের সাথে জুনিয়রদের এই পার্থক্য দেখা গেছে।
প্রশ্ন: খেলার মোড় যখন দ্রুত ঘুরে যায়, তখন তরুণ খেলোয়াড়দের মাথা ঠান্ডা রাখার প্রশিক্ষণ আপনি কীভাবে দিয়েছেন?
আইকম্যান: অনুশীলনেও আমরা হার-জিতের আবহ তৈরি করতাম। হারলে শাস্তি হিসেবে বুকডন বা দৌড়াতে হতো। ভালো বা খারাপ আচরণের জন্য তারা তাৎক্ষণিক ফিডব্যাক পেত। দলের সিনিয়র বা লিডারদের আমরা ব্যবহার করেছি, যাতে তারা অন্যদের ভুল ধরিয়ে দিয়ে সঠিক পথে রাখতে পারে।
প্রশ্ন: ঢাকায় ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ দলের সঙ্গে আপনার চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আপনার জন্য এই চার মাস কেমন ছিল? কোনো আক্ষেপ আছে কি?
আইকম্যান: এখানে কাজ করাটা দারুণ ছিল, তবে বেশ নিঃসঙ্গও কেটেছে। কাজের বাইরে আমাকে হোটেলেই থাকতে হতো। তবে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আমি আমার স্টাফদের সঙ্গে মিলে ভালো কাজ করেছি এবং ভবিষ্যতে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আশিক ও বিপ্লবকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছি। খেলোয়াড়দের নিবেদন, আবেগ ও দলের প্রতি ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার কোচিং স্টাফ ও আম্পায়াররা- সবাই মিলে আমরা একটা পরিবারের মতো ছিলাম।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ হকির সঙ্গে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য কাজ করার কোনো ইচ্ছা কি আপনার আছে?
আইকম্যান: এই টুর্নামেন্টের পর আমি বাড়ি ফিরে নাতি-নাতনিদের সময় দেব। পরিবার ছাড়া বিদেশে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করা খুব কঠিন এবং একাকীত্বের। আমি সব সময় বাংলাদেশ হকির শুভাকাঙ্ক্ষী থাকব। তবে স্ত্রী সাথে না থাকলে আমি আর দীর্ঘমেয়াদী কোনো দায়িত্ব নেব না, আর সেটা হওয়াটা এখন বেশ কঠিন।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: