[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ৪ঠা জুন ২০২৬
২১শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রথমবার এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের মেয়েদের হকি, ইতিহাস গড়ল অর্পিতা–কনারা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:০৪ পিএম

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করল নারী হকি দল। বিশ্ব ক্রীড়ার সর্বোচ্চ আসর অলিম্পিকের পরই মাল্টি-স্পোর্টস ইভেন্ট হিসেবে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এশিয়ান গেমস-এ এবারই প্রথম অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মেয়েরা। জাপানের আইচি-নাগোয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আসরে জায়গা নিশ্চিত করে দেশের নারী হকি এক নতুন যুগে প্রবেশ করল।

১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশ নিয়মিত এশিয়ান গেমসে অংশ নিলেও এতদিন প্রতিনিধিত্ব ছিল কেবল পুরুষ হকি দলের। দীর্ঘদিনের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার নারী দলও জায়গা করে নিল মহাদেশীয় এই আসরে। আর এই সাফল্যের পেছনে বড় অবদান রেখেছেন অর্পিতা পাল, কনা ও তাদের সতীর্থরা।

এশিয়ান গেমসে জায়গা করে নিতে এশিয়ান হকি ফেডারেশন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় আয়োজন করে বাছাই টুর্নামেন্ট। সেখানে ‘এ’ গ্রুপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে শীর্ষ দুইয়ের একটি হয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পাশাপাশি এশিয়ান গেমসের টিকিট কেটে নেয় বাংলাদেশ।

গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের শুরুটা ছিল আত্মবিশ্বাস জাগানিয়া। প্রথম ম্যাচে চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ৫-৫ গোলে ড্র করে লড়াকু মনোভাবের পরিচয় দেয় দলটি। পরের ম্যাচে উজবেকিস্তানকে ২-১ গোলে হারিয়ে অভিষেক আন্তর্জাতিক জয়ের স্বাদ পায় মেয়েরা। ফলে শেষ ম্যাচে হংকংয়ের বিপক্ষে একটি ড্র-ই যথেষ্ট ছিল সেমিফাইনালে ওঠার জন্য।

কিন্তু সেখানে থেমে থাকেনি জাহিদ হোসেন রাজুর শিষ্যরা। হংকংয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে তারা। ম্যাচের শুরুতেই পিছিয়ে পড়লেও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। সমতায় ফেরার পর তৃতীয় কোয়ার্টারে কনার দারুণ এক গোলে এগিয়ে যায় দলটি। এমার বাড়ানো বল গোলরক্ষকের সামনে পেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় জালে জড়ান কনা। শেষ পর্যন্ত এই লিড ধরে রেখেই জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।

তিন ম্যাচ শেষে সাত পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করেছে বাংলাদেশ। যদিও চাইনিজ তাইপে ও উজবেকিস্তানের ম্যাচের ফলাফলের ওপর গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নির্ভর করছে, তবে সেমিফাইনাল নিশ্চিত হওয়ায় এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের স্বপ্ন ইতোমধ্যেই পূরণ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে হকির ইতিহাস বেশ পুরোনো হলেও নারী হকি এতদিন ছিল অবহেলিত। কোনো সিনিয়র জাতীয় দলই ছিল না। সম্প্রতি হকি ফেডারেশন উদ্যোগ নিয়ে গঠন করে নারী সিনিয়র দল। বিকেএসপির তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়েই মূলত গড়া এই দলটি প্রথম আন্তর্জাতিক আসরেই দেখিয়েছে অসাধারণ সম্ভাবনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্জন শুধু একটি টুর্নামেন্ট জয়ের সাফল্য নয়—এটি দেশের নারী ক্রীড়ার জন্য এক বড় অগ্রগতি। দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট ও ফুটবলে সাফল্যের গল্প শোনা গেলেও হকিতে এমন অর্জন নতুন দিগন্ত খুলে দিল।

কোচ জাহিদ হোসেন রাজুর অধীনে দলটির শৃঙ্খলা, ফিটনেস এবং আক্রমণাত্মক খেলায় স্পষ্ট উন্নতি দেখা গেছে। খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তাও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে কঠিন মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই দলটিকে এনে দিয়েছে এই ঐতিহাসিক সাফল্য।

এশিয়ান গেমসের মঞ্চে এখন অপেক্ষা আরও বড় চ্যালেঞ্জের। শক্তিশালী ভারত, চীন, জাপান কিংবা কোরিয়ার মতো দলগুলোর বিপক্ষে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে বাংলাদেশকে। তবে এই তরুণ দলটির সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স আশার আলো দেখাচ্ছে।

প্রথমবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রেখেই এশিয়ান গেমসে জায়গা করে নেওয়া—এটি নিঃসন্দেহে এক অনন্য কীর্তি। বাংলাদেশের নারী হকি দল প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে তারাও পারে ইতিহাস গড়তে। এখন সবার নজর আইচি-নাগোয়ার দিকে, যেখানে নতুন স্বপ্ন নিয়ে নামবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর