ক্রিকেটার থেকে আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী মঈন খুরশীদ
ক্রিকেটে অলরাউন্ডার ছিলেন মঈন খুরশীদ। ছিলেন উইকেটকিপার কাম ব্যাটার। ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতা মঈনের। এই উচ্চতা কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত পেস বোলিং করতেন।
শৈশবে প্রচুর ক্রিকেট খেলতেন। হতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটার। নব্বইয়ের দশকে দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে ধানমন্ডি প্রগতি সংঘের হয়ে নিয়মিত খেলেছেন মঈন খুরশীদ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিতে পারেননি। ক্রিকেট ছেড়ে ধীরে ধীরে নিজেকে পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
মঈন খুরশীদকে আত্মীয় স্বজনেরা রয়েল নামেই চেনেন। তার জন্ম ও শৈশব কেটেছে ঢাকাতে। কিন্তু একটা সময় তিনি চলে যান বন্দর নগরী চট্টগ্রামে। সেটাই মঈন খুরশীদের জন্মভূমি। চট্টগ্রামে বহদ্দারহাট চৌধুরী বাড়ি তার নানা বাড়ি। তবে তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কোয়েপাড়া গ্রামে।
মা মোমেনা আক্তার ছিলেন ডেসার (ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই অথোরিটি) পদস্থ কর্মকর্তা। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এ ওয়াই এম খুরশীদ আলম চৌধুরী। বাবা-মা দুজনই প্রয়াত। স্ত্রী প্রভা ও ছেলে সাহিলকে নিয়ে বর্তমানে উত্তরায় থাকেন মঈন।
ক্রিকেটে অলরাউন্ডার ছিলেন মঈন খুরশীদ। ছিলেন উইকেটকিপার কাম ব্যাটার। ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি উচ্চতা মঈনের। এই উচ্চতা কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত পেস বোলিং করতেন। ক্যারিয়ারে তাঁর সেরা বোলিং ফিগার ৩৬ রানে ৭ উইকেট। দুটো হ্যাটট্রিকও রয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় বিভাগে দুটি সেঞ্চুরিও রয়েছে মঈন খুরশীদের।

মঈন খুরশীদের ক্যামেরায় লাস্যময়ী নেপালী তরুণী। ছবি: সংগৃহীত
ক্রিকেট খেলতে গিয়ে এক পর্যায়ে চোটে পড়েন মঈন খুরশীদ। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে প্রিয় খেলাটা ছেড়ে দিতে হয়।
মঈন বলেন, “আমার স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলব। স্বপ্ন ছিল অনেক বড় ক্রিকেটার হবো। কিন্তু ইনজুরি সব শেষ করে দিল।” তিনি জানান তার প্রিয় ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও আকরাম খান।
নব্বইয়ের দশকের খেলার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মঈন খুরশীদ বলেন, “আমি তখন পার্থ তানভীর নভেদ ও বুলবুলের বড় ভাই রফিকুল ইসলামকে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছি। উনারা ছিলেন সিনিয়র ক্রিকেটার। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ভালোবাসতেন। তখন আবাহনীতে খেলতেন আকরাম খান। উনি আমার খেলা দেখে আমাকে আবাহনীতে খেলার প্রস্তাব দেন।” মঈন ধানমন্ডির ক্লাবে খেলেছেন ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে। চোটের কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ১৯৯৯ সালে।
খেলা ছেড়ে কিভাবে আলোকচিত্রী হয়ে উঠলেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কাঁধের ইনজুরির কারণে চিকিৎসক বলেছিলেন ক্রিকেট খেলা যাবেনা। এরপর বাধ্য হয়ে খেলা ছেড়ে দিতে হয়। তখন ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। আসলে আমার মায়ের স্বপ্ন ছিল আমি যেন বাবার মতো সেনাবাহিনীর অফিসার হই। কিন্তু আমি ক্রিকেটকে বেছে নিয়েছিলাম। অথচ ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। ওই সময় একদিন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখি চঞ্চল মাহমুদের ফটোগ্রাফি কোর্সের। এরপর ফটোগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হই। সেই থেকে টানা ২৬ বছর ফটোগ্রাফি করে যাচ্ছি।”

ভূমিকম্পের পর মঈনের ক্যামেরায় নেপালের কাঠমান্ডু শহর। ছবি: সংগৃহীত
ফটোগ্রাফি করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন মঈন। বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। এরই মধ্যে সৌদি আরব, থাইল্যান্ড, ভারত ও নেপাল সফর করেছেন। তবে নেপালে তিনি সবচেয়ে বেশি বার গিয়েছেন। এখনও সময় ও সুযোগ পেলেই নেপালে গিয়ে বিভিন্ন রকমের ছবি তোলেন। ২০১৫ সালে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর সেখানে গিয়ে ছবি তুলেছিলেন তিনি। এই দেশটিকে ভালোবেসে প্রচুর ফটোগ্রাফি করেছেন। মঈন জানান, “নেপাল ইজ মাই সেকেন্ড হোম। এই দেশকে প্রচুর ভালোবাসি। আমার মাতৃভূমির পর এই দেশকে আমি খুব ভালোবাসি।” ভবিষ্যতে নেপালের বিভিন্ন জায়গায় করা ফটোগ্রাফি নিয়ে একটা বই প্রকাশের ইচ্ছা রয়েছে মঈনের।
একজন গুণী শিল্পীর শিল্প-সমালোচনা করতে পারেন শিল্প বোদ্ধারা। তার দোষ-ত্রুটি, ভালো মন্দ সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ বের হয়ে আসে এসব সমালোচনায়। কিন্তু একজন দর্শক যাকে আমজনতা বলা যায় তিনি যখন শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম দেখে বলে ওঠেন চমৎকার, এখানেই নিহিত শিল্পীর মূল স্বার্থকতা। মঈন খুরশীদের আলোকচিত্র অনেকটা এরকমই।
মঈনের প্রথম আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে বিপিএসের (বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি) আলোকচিত্রাচার্য এমএ বেগ জাতীয় গ্যালারিতে। শিরোনাম ছিল ‘মানুষ ও সংস্কৃতি’। মঈন খুরশীদের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য আলোকচিত্র- ক্যান্ডেল লাইট ওয়ান, আওয়ার লাইফ আওয়ার ফেইথ, সিল্যুট লাইফ, মনিপুরী ড্যান্স ওয়ান অ্যান্ড টু, চাইল্ড ভ্যান পুলার, চিলড্রেন অব আনসার্টেনিটি, শকুন্তলা ড্যান্স প্রভৃতি।

মঈন খুরশীদের ফটোগ্রাফি নেপালে। ছবি: সংগৃহীত
শিল্পের বিভিন্ন শাখায় এই মানুষটির রয়েছে নিভৃত পদচারণা। ফটোগ্রাফিতে তার প্রিয় বিষয় লাইফ স্টাইল , ন্যাচার, পোট্রেট, নৃত্যকলা ও ল্যান্ডস্কেপ।
একজন ফটোগ্রাফারের বাইরেও তার আরও একটি বড় পরিচয় আছে। তিনি একজন সংগ্রাহক। বিভিন্ন দেশের ডাকটিকিট সংগ্রহ করেন। বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংগ্রহে রয়েছে। এরপর তিনি সংগ্রহ করতে শুরু করেন দেশ বিদেশের দেশলাই। তিনি জানান, এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ৩০০ দেশলাই সংগ্রহ করেছেন। এছাড়াও তার সংগ্রহে রয়েছে ৫০০ চাবির রিং।
মঈন বলেন, “সংগ্রহ করতে আমার ভালো লাগে। সংগ্রহ থেকে যেমন আমি জ্ঞান আরোহন করি তেমনিভাবে পাই মানসিক প্রশান্তি। তাই যতদিন সম্ভব আমি সংগ্রহ করে যাব।”

মঈন খুরশীদের আলোকচিত্রী। ছবি: সংগৃহীত
ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন মঈন খুরশীদ। কিন্তু কে জানতো নিয়তি তাকে একজন আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফার বানিয়ে দেবে। মঈনের আলোকচিত্রে মুভমেন্ট, লাইটিং, কালার, রঙের বৈচিত্র্য, কম্পোজিশন-এগুলো দর্শকের দৃষ্টি এড়ায় না। রঙের এই বৈচিত্র্য ছবির মাধ্যমে তিনি ছড়িয়ে দিতে চান সারা বিশ্বে। পৃথিবীর বুকে ফটোগ্রাফি দিয়েই মঈন খুরশীদ একদিন লাল সবুজের মানচিত্রকে তুলে ধরতে চান সবার ওপরে।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: