ব্যাটিং ও অধিনায়কত্বের মুনশিয়ানা দেখিয়ে শান্তই হলেন ম্যাচসেরা
ঘড়ির কাঁটায় তখন সোয়া চারটা। গত ৪ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করা যাচ্ছিল, বড়জোর আর এক ঘণ্টার মতো খেলা মাঠে গড়াতে পারে। অর্থাৎ পাকিস্তানের শেষ পাঁচ উইকেট নেয়ার জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় ছিল ঘণ্টাখানেকের মতোই।
নিশ্চিত ড্র আন্দাজ করতে পারায় দর্শকদের মধ্যেও ততক্ষণে হতাশার ছাপ চলে এসেছিল। এক ঘণ্টা আগে পরপর দুই ওভারে সালমান আগা এবং আব্দুল্লাহ ফজল আউট হওয়ার পর জেগে ওঠা সমর্থকরা অনেকটাই নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ছিলেন ম্যাড়মেড়ে ড্রয়ের আশঙ্কায়।
পাকিস্তানের দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার সৌদ শাকিল এবং মোহাম্মদ রিজওয়ান তখন উইকেটে অনেকটাই সেট। তাদের পরিকল্পনা ততক্ষণে পরিষ্কার। ব্যাটিংয়ের শুরুর দিকে জয়ের চেষ্টা করলেও পাঁচ উইকেট পড়ার পর সেই পরিকল্পনা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে সফরকারীরা। কোনোমতে ড্র নিয়ে ঢাকা টেস্ট শেষ করার দিকে এগোচ্ছিলেন সৌদ এবং রিজওয়ান।
এমনই এক নিষ্প্রাণ পরিস্থিতি থেকে ঢাকা টেস্টে প্রাণ ফিরিয়েছেন নাহিদ রানা। মাত্র ২৯ বলেই বদলে দিয়েছেন ম্যাচের গতিপথ। শেষ ৪ ওভার ৫ বলের স্পেলে ২ মেডেনে ১০ রান দিয়ে নিয়েছেন ৪ উইকেট। সঙ্গে তাইজুলের এক উইকেটে মাত্র ৪০ মিনিটে পাকিস্তানের শেষ ৫ উইকেট নিয়ে ঢাকা টেস্টে স্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে টাইগাররা।
নাহিদের পাশাপাশি কৃতিত্বটা দিতে হবে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তকেও। ম্যাচের জটিল পরিস্থিতিতেও স্নায়ুচাপ ধরে রেখে দারুণভাবে দল পরিচালনা করেছেন। বিশেষ করে, শেষ স্পেলে নাহিদ যখন বল করতে এলেন, শান্তর পরামর্শেই সৌদ শাকিলকে ফাঁদে ফেলেছিলেন নাহিদ।
১৫ রানের ইনিংসে এর আগে একবার কাভার ড্রাইভে চার মেরেছেন সৌদ। অফ সাইডে জোনের মধ্যে বল পেলে ব্যাটও চালাচ্ছিলেন কিছুটা থিতু হয়ে যাওয়া এই ব্যাটার। সেই ফাঁদেই তাকে ফেলেছেন নাহিদ-শান্ত। নাহিদের অফ স্ট্যাম্পের বাইরে পিচ করা বলটা ড্রাইভ খেলতে গিয়ে কট বাহাইন্ড হন সৌদ। বাংলাদেশ পেয়ে যায় কাঙ্ক্ষিত উইকেট। স্টেডিয়ামও ফিরে পায় প্রাণ।
পরের ওভারে আবারও নাহিদ জাদু। এবার স্বপ্নের মতো একটা বলে আউট করলেন রিজওয়ানকে। ১৪৭ কি.মি. গতির দুর্দান্ত ইনসুইঙ্গার লিভ করতে গিয়ে হলেন বোল্ড। পাকিস্তানের সর্বশেষ স্বীকৃত ব্যাটারকে ফিরিয়ে বাংলাদেশ ততক্ষণে জয়ের সুবাস পেতে শুরু করেছে। পরের ওভারে হাসান আলীকে এলবিডব্লুর জয়টা অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেন তাইজুল ইসলাম।
এর আগে পরপর দুই ওভারে উইকেট নিয়ে ভক্তদের মধ্যে একরকম প্রত্যাশা তৈরি করে ফেলেছিলেন নাহিদ। সে কারণেই এই ওভারে তাকে বল হাতে দেখে গর্জে ওঠেন তারা। নাহিদও ভক্তদের প্রত্যাশার জবাব দিয়েছেন। ওভারের চতুর্থ বলে নোমান আলীকে এলবিডব্লু করেন এই এক্সপ্রেস পেসার। রিভিউ নিয়ে বাঁচতে পারেননি নোমান।
পরের ৩ ওভারে কোনো উইকেট আসেনি। এক প্রান্তে তাইজুলকে পরিবর্তন করে মিরাজকে আনেন শান্ত। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। নাহিদই শেষ পেরেকটা ঠুকলেন পাকিস্তানের কফিনে৷ শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ফেললেন বাউন্সারের ফাঁদে। ম্যাজিকাল এক স্পেলে ড্র থেকে টেনে তুলে দলকে জয়ে এনে দেন নাহিদ রানা।
পঞ্চম দিনটা যে রোমাঞ্চকর হতে যাচ্ছে, তার ইঙ্গিতটা অবশ্য আগেভাগেই পাওয়া যাচ্ছিল। ম্যাচের প্রতিটি দিনই নতুন নতুন মোড় নিয়ে সে আভাসকে আরও জোরদার করছিল।
টস হেরে ম্যাচের প্রথম দিন ৪ উইকেটে ৩০১ রান করে চালকের আসনে থেকে দিন শেষ করে বাংলাদেশ। তবে পরের দিন ১১২ রানে বাকি ৬ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরত আসে পাকিস্তান। ওইদিন ব্যাট হাতেও দাপট দেখায় সফরকারীরা। আজান আওয়াইসের ব্যাটে কেবল ১ উইকেট হারিয়ে ১৭৯ রান করে সফরকারীরা।
তৃতীয় দিনের শুরুটা ছিল আবার বাংলাদেশের। তাসকিন আহমেদ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের দাপটে এদিন ৫১ রান তুলতে ৪ উইকেট হারায় পাকিস্তান। ১ রানের ব্যবধানে সালমান আলী আগার গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটিও প্রায় পেয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে বেরসিক নো বলের কারণে বাদ যায় সেই উইকেটটি। পরে সালমান এবং রিজওয়ানের বড় জুটিতে তৃতীয় দিনে ভাগ বসায় পাকিস্তানও। তবে ২৭ রানের লিড পায় বাংলাদেশ।
নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৯ উইকেটে ২৪০ রান করে যখন ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ, তখন ম্যাচের বাকি ৭৬ ওভার। পাকিস্তানের দরকার ছিল ২৬৮ রান, বাংলাদেশের ১০ উইকেট। দুই দলের জন্যই জয় তুলে নেয়ার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের দিকে কিছুটা হলেও ঝুঁকে ছিল ম্যাচ।
প্রথম ওভারে ইমাম-উল-হককে ফিরিয়ে সেই অবস্থানটা আরও শক্ত করে বাংলাদেশ। তবে দ্বিতীয় এবং চতুর্থ উইকেটে দুটো পঞ্চাশ রানের জুটি গড়ে কিছুটা চোখ রাঙাচ্ছিল পাকিস্তানও। কিন্তু শেষমেশ নাহিদের নৈপূণ্যে জয় তুলে নিল বাংলাদেশই।
চতুর্থ ইনিংসে ৯ ওভার ৫ বল করে ৪০ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়েছেন নাহিদ। ১০ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে তার দ্বিতীয় ফাইফার এটি। প্রথম ইনিংসেও নিয়েছেন ১ উইকেট।
নাহিদ ছাড়া দ্বিতীয় ইনিংসে দুটি করে উইকেট নিয়েছেন তাসকিন আহমেদ এবং তাইজুল ইসলাম। মেহেদী হাসান মিরাজ নিয়েছেন ১ উইকেট।
ঢাকা টেস্ট জয়ের অন্যতম কৃতিত্ব যাবে অধিনায়ক নাজমুল শান্তর ঝুলিতেও। দুই ইনিংসেই ব্যাট হাতে অনবদ্য ছিলেন তিনি। প্রথম ইনিংসে ১০০ রানে পর দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি মিস করেছেন মাত্র ১৩ রানে। অধিনায়কত্বও ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে ম্যাচসেরাওও হয়েছেন অধিনায়কই।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: