[email protected] রবিবার, ১৯শে জুলাই ২০২৬
৪ঠা শ্রাবণ ১৪৩৩

ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর নতুন অ্যাডহক কমিটি ঘিরে বিতর্কের ঝড়

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬ ১৪:০৭ পিএম

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) ঘোষিত ২৮টি ক্রীড়া ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটি প্রকাশের পর থেকেই ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। কমিটির আকার, সদস্য নির্বাচন এবং কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলেছেন ক্রীড়া সংগঠক ও সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার ঘোষিত এসব কমিটির মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত কমিটিগুলো বাতিল করে নতুন অ্যাডহক কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে ঘোষণার পরই আলোচনায় আসে সাধারণ সম্পাদক ফোরামের সভাপতি এমএ কুদ্দুস খান ও সাধারণ সম্পাদক দিলদার হাসানের নাম। বক্সিং ও উশু ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁদের পুনর্বহাল হওয়ায় কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্রীড়াঙ্গনের একটি অংশের অভিযোগ, কমিটি গঠনের সময় অনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদেরই আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

নতুন ঘোষিত কমিটির আকার নিয়েও রয়েছে বিস্ময়। কোনো ফেডারেশনে ২৫ সদস্য, আবার কোনোটি ২৯ সদস্যের করা হয়েছে। এ ধরনের অসামঞ্জস্যের কারণ ব্যাখ্যা না করায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত অ্যাডহক কমিটিগুলো ভেঙে এবার নতুন কমিটি করা হয়েছে। অথচ সে সময় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদই জানিয়েছিল, বিশেষ পরিস্থিতিতে গঠিত ওই কমিটিগুলোর নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকবে না এবং সরকার প্রয়োজন মনে করা পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবে। এবার নতুন কমিটি ঘোষণার ক্ষেত্রে আগের কমিটিগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন আয়োজন করতে না পারার ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করা হলেও, অনেকের মতে সেই দায় কেবল ফেডারেশনগুলোর নয়; জাতীয় ক্রীড়া পরিষদেরও রয়েছে। ফলে এই সিদ্ধান্তকে নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলেই মনে করছেন অনেকে।

গত ফেব্রুয়ারিতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক তারকা ফুটবলার আমিনুল হক দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে একটি সুপারিশ কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে কমিটি নিয়ে ওঠা সমালোচনার দায় সুপারিশকারী কমিটির ওপরও বর্তাচ্ছে বলে মত ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের।

২৮টি ফেডারেশনের মধ্যে সাতটিতে আগের সাধারণ সম্পাদকদের বহাল রাখা হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাথলেটিকস, কাবাডি, দাবা, তায়কোয়ান্দো, শুটিং, সাঁতার, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, জুডো, কারাতে, হকি, সাইক্লিংসহ বেশ কয়েকটি ফেডারেশনে নতুন সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পেয়েছেন।

প্রথম দফায় ২৮টি ক্রীড়া ফেডারেশনে নতুন অ্যাডহক কমিটি দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। যেখানে প্রধান নির্বাহীর (ইডি) সাক্ষর রয়েছে। ২৮টি কমিটির মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেওয়া আটজন সাধারন সম্পাদক পদেই বহাল রয়েছেন। বক্সিংয়ে এমএ কুদ্দুস খান, উশুতে দিলদার হাসান, জিমন্যাস্টিক্সে হাবিবুর রহমান জামিল, কুস্তিতে মেসবাহ উদ্দিন আজাদ, হ্যান্ডবলে সালাউদ্দিন আহমেদ, রাগবিতে আখতার জামান এবং টেনিসে ইশতিয়াক আহমেদ কারেন। তবে যেসব ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক পদে পরিবর্তন এসেছে সেগুলো হলো- অ্যাথলেটিকসে অ্যাডভোকেট আলী ইমাম তপন, কাবাডিতে ইসরাইল হাওলাদার, আরচারিতে সৈয়দ তানভীর, ক্যারমে আজহারুল ইসলাম কনক, খো খোতে রায়হান উদ্দিন ফকির, জুডোতে নয়না চৌধুরী, টেবিল টেনিসে সাইদুল হক সাদী, তায়কোয়ান্দোতে মাহমুদুল ইসলাম রানা, দাবায় গ্রান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ, ফেন্সিংয়ে কাজী সাইফুল হক, ব্যাডমিন্টনে কাজী হাসিবুর রহমান, ভলিবলে আবদুল মুমিন সাদ্দাম, ভারোত্তোলনে এসএম কাজল, মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় শারমিন আক্তার রতœা, রোইংয়ে সাইফুদ্দিন আলী, শুটিংয়ে সাকিফ শামীম, সাইক্লিংয়ে পারভেজ হাসান, সুইমিংয়ে সৈয়দ আমিনুল হক দেওয়ান সজল, কারাতেতে সৈয়দ নুরুজ্জামান সিনথিয়া এবং হকিতে ইশতিয়াক সাদেক।

তবে নতুন কমিটির বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাবেক শুটার শারমিন আক্তার রত্নাকে একই সঙ্গে মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এবং শুটিং ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক করা হয়েছে। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের ২৯ সদস্যের কমিটিতে জায়গা হয়নি সাবেক তারকা অ্যাথলেট ও কোচ মো. ইয়াহিয়ার। আবার ভলিবল ফেডারেশনে এমন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাঁর বিরুদ্ধে অতীতে কমিটি গঠনকে ঘিরে অনৈতিক অর্থ লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল। সাঁতার ফেডারেশনে দীর্ঘদিনের সংগঠকদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠক অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা সৈয়দ আমিনুল হক দেওয়ান সজল সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়াও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এসব সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিতকরণ, সমস্যা নিরসন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে গঠিত কমিটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ান বলেন, "মহিলা ক্রীড়া সংস্থা ও শুটিং দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান। তাই শারমিন আক্তার রত্না দুটি জায়গাতেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এতে কোনো সমস্যা নেই।" আগের আটজন সাধারণ সম্পাদককে বহাল রাখার বিষয়ে তাঁর মন্তব্য, "সবাইকেই তো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।"

নতুন অ্যাডহক কমিটিগুলো নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন কত দূর গড়ায় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এসব অভিযোগের বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিই এখন ক্রীড়াঙ্গনের বড় আলোচনার বিষয়।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর