প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে ফুটবল: অফসাইডে বাতিল গোলও ফিরছে স্কোরশিটে
ফুটবলে গোল মানেই উল্লাস, আবেগ আর উদযাপন। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে গোল হওয়ার পরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে দর্শক ও খেলোয়াড়দের। কারণ, প্রযুক্তির যুগে মাঠের সিদ্ধান্তই আর শেষ কথা নয়। অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হচ্ছে, আবার কখনও বাতিল হতে যাওয়া গোলও প্রযুক্তির সহায়তায় বৈধতা পাচ্ছে। এ কারণেই চলমান বিশ্বকাপকে অনেকেই বলছেন ‘প্রযুক্তির বিশ্বকাপ’।
বিশ্বকাপের বিভিন্ন ম্যাচে প্রযুক্তির প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অফসাইড নির্ধারণে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) ব্যবহারের ফলে রেফারিদের সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল হয়েছে। মাঠে রেফারি বা সহকারী রেফারির চোখ এড়িয়ে যাওয়া অনেক বিষয় এখন ধরা পড়ছে ক্যামেরা ও সেন্সরের মাধ্যমে।
এর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা গেছে আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচে। ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনা একাধিকবার বল জালে জড়ালেও প্রযুক্তির বিশ্লেষণে দুটি গোল অফসাইড হিসেবে বাতিল হয়। মাঠে উপস্থিত দর্শকদের অনেকের কাছেই গোলগুলো বৈধ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু রিপ্লে এবং ডিজিটাল অফসাইড লাইনের মাধ্যমে দেখা যায়, আক্রমণভাগের খেলোয়াড় সামান্য এগিয়ে ছিলেন। ফলে নিয়ম অনুযায়ী গোল বাতিল করা হয়।
ফুটবলের এই নতুন প্রযুক্তিতে স্টেডিয়ামের চারপাশে স্থাপিত বিশেষ ক্যামেরাগুলো খেলোয়াড়দের শরীরের বিভিন্ন অংশের অবস্থান প্রতি সেকেন্ডে বহুবার পর্যবেক্ষণ করে। একই সঙ্গে ম্যাচ বলের ভেতরে থাকা সেন্সর বল স্পর্শের সঠিক মুহূর্ত নির্ধারণ করে। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অফসাইডের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়। এর ফলে মানবিক ভুলের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।
বিশ্বকাপের আগে ফুটবলে ভুল অফসাইড সিদ্ধান্ত নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক দল গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কেউ কেউ অন্যায্য সুবিধাও পেয়েছে। তবে বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় সেই বিতর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এখন কোনো গোল নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলেই VAR কক্ষে থাকা কর্মকর্তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করেন এবং প্রয়োজন হলে রেফারিকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।
যদিও প্রযুক্তির এই ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেক ফুটবলপ্রেমীর মতে, গোল উদযাপনের স্বাভাবিক আনন্দ কিছুটা কমে গেছে। গোল হওয়ার পরও নিশ্চিত হতে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কখনো দীর্ঘ সময় ধরে VAR যাচাইয়ের কারণে খেলার গতি ব্যাহত হয়। তবুও অধিকাংশ কোচ, খেলোয়াড় ও বিশ্লেষক মনে করেন, সঠিক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তির বিকল্প নেই।
ফিফার লক্ষ্য ফুটবলকে আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করে তোলা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এখন আর শুধু রেফারির চোখের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। বরং ক্যামেরা, সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মিলেই নির্ধারণ করছে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
অফসাইডে গোল বাতিল হওয়া কিংবা বাতিল হতে যাওয়া গোলের বৈধতা ফিরে পাওয়া—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের মাঠে এখন প্রযুক্তিই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। তাই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এবারের বিশ্বকাপ শুধুই তারকাদের লড়াই নয়, বরং প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বেরও এক অনন্য প্রদর্শনী। এ কারণেই একে বলা হচ্ছে—‘প্রযুক্তির বিশ্বকাপ’।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: