কাঁপন ধরানো ম্যাচে ইংল্যান্ডের রক্ষা, কঙ্গোর স্বপ্নভঙ্গের রাত
‘ইটস কামিং হোম’ - এই স্লোগানটাই যেন বছরের পর বছর ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযানের প্রতীক। এই এক স্লোগানেই নতুন আশা, স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ মঞ্চে মাঠে নামে ইংল্যান্ড। সমর্থকরাও আশায় বুক বাধে। গ্রুপ পর্বে দাপটের সঙ্গে পথচলায় সেই আশার স্রোত মিশে যায় মোহনায়। যেখানে একটি ট্রফির জন্য তাদের অপেক্ষা ১৯৯৬ সাল থেকে।
এরপর কতো নায়ক, মহায়নায়ক এলো সেই থ্রি লায়ন্সের শিবিরে। একেক জনের দখলে কতো গোল, কতো সহস্র অর্জন। কিন্তু বিশ্বকাপের সেই সোনালী ট্রফি কেউ এনে দিতে পারেন না। ২০২৬, সেই হাহাকারের তালিকায় যুক্ত হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু নাহ…
এবার একজন হ্যারি কেইন আছেন। যিনি অজুত নিযুত ঘামবিন্দু ঝরিয়ে, চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় ইংল্যান্ডকে জেতাতে পারেন। সামর্থ্যের শেষটা দিয়ে লড়তে জানেন। হারার আগে হারতে চান না। গ্রুপ পর্বে দেখিয়েছেন কারিশমা। সেখান থেকে নক আউটের প্রথম পরীক্ষায় কেইন পেয়ে গেলেন লেটার মার্কস। তার জোড়া গোলে ডিআর কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইংল্যান্ড পেয়ে গেছে প্রি কোয়ার্টারের টিকিট। আর আলো ছড়িয়ে, ইংল্যান্ডকে কাঁপন ধরিয়ে ডিআর কঙ্গো জিতে নিয়েছে সমর্থকদের হৃদয়।
ম্যাচটায় কঙ্গো যা করলো তাদের বাহবাই দিতে হবে। প্রতিপক্ষ নিয়ে ইংল্যান্ডের চিন্তার কারণ থাকার কথা নয়। দাপটের সঙ্গে সবুজ ঘাসে গোলের আনন্দে মেতে উঠার কথা। কিন্তু তারাও কিনা ৭৫ মিনিট পর্যন্ত তিলে তিলে মরে! ইংল্যান্ডের কাঁপন ধরে যায় ডাগ আউটে। সমর্থকরাও চোখের কোণে অশ্রু জমা করেন। দুশ্চিন্তায় থাকেন থমাস টুকেল।
৭৫ মিনিটে মাহেন্দ্রক্ষণ। হেডে কঙ্গোর গোলরক্ষক এমপাসিকে ফাঁকি দেন কেইন। এর আগে একাধিকবার বেলিংহাম, রাশফোর্ড, কেইনের গোল ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন কঙ্গোর গোলপোস্টের প্রহরী। এবারও চেষ্টা করেছেন। হাত লাগিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ৭ মিনিটে গোল হজমের পর ৭৫ মিনিটে সমতা ফেরায় ইংল্যান্ড।
এরপর ঠিক ১১ মিনিট পর কেইন ডানপায়ের কোনাকুনি জোরালো শটে ভেঙে দেন বাধার দেয়াল। কঙ্গোর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে কেইন ম্যাচের এপিটাফ লিখে ফেলেন নান্দনিকতায়, ঐশ্বর্যে বুদ করে। তাতে কঙ্গোর হৃদয় ভেঙে চুরমার। রূপকথার গল্প লেখার অপেক্ষায় ছিল মধ্য আফ্রিকার দেশটি। কিন্তু শেষ কয়েক মিনিটের লড়াই জিতে ইংল্যান্ড পড়েছে বিজয়ের তিলক। আর পরাজয়ের হাহাকার, হৃদয় ভাঙার আর্তনাদ নিয়ে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম ছাড়তে হয়েছে কঙ্গোকে।
অথচ ম্যাচটা কেমন যাবে সেই সুর তারাই বেধে দিয়েছিল। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৭ মিনিট। দুই দলের খেলোয়াড়দের শরীর গরমও হয়ে উঠেনি! নেই তেমন কোনো আক্রমণ। কিংবা সুন্দর ফুটবল প্রদর্শণী। এমনিতেও ম্যাচ নিয়ে আলোচনা কম। ইংল্যান্ডের পক্ষেই বাজির দর! সেখানে বাড়তি উন্মাদনা কিংবা চমকপ্রদ কিছু না হলে ম্যাচ একপেশেই হওয়ার কথা। কিন্তু না! তেমন কিছু হলো না।
পুরো পৃথিবীর চোখ ডিআর কঙ্গো কেড়ে নিল। তারা জানিয়ে দিল, ইংল্যান্ডকে ছেড়ে কথা বলবে না। ইংল্যান্ডকে স্তব্ধ করে কঙ্গোকে এগিয়ে নেন ব্রায়ান সিপেঙ্গা। বক্সের বাঁ দিক থেকে ডান পায়ের শটে বল জালে জড়ান এই ফরোয়ার্ড। অধিনায়ক শানসেল এমবেম্বার লম্বা ক্রস থেকে ফাঁকায় বল পান ব্রায়ান। সময় নিয়ে বল জালে পাঠাতে ভুল করেননি ব্রায়ান।
যেকোনো প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়ে ইংল্যান্ড শুরুতেই পিছিয়ে যায়। এরপর আক্রমণের বন্যা বইয়ে দেয় তারা। প্রথমার্ধের আগেই অন্তত তিনটি সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এমপাসিকে পরাস্ত করতে পারেননি কেইন, বেলিংহ্যামরা।
এরপর দ্বিতীয়ার্ধেও ইংল্যান্ড সারাশি আক্রমণ চালায়। কিন্তু কঙ্গোর রক্ষণ ভাঙতে পারে না। দ্বিতীয়ার্ধের ডিহাইড্রেসন ব্রেকও শেষ হয়ে যায়। ইংল্যান্ডের সমর্থকদের দিকে তাকানোও যাচ্ছিল না। কিন্তু থ্রি লায়ন্সের অধিনায়ক কেইন ছিলেন আত্মবিশ্বাসী।
দাপটের সঙ্গেই সতীর্থদের নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যান। ৭৫ মিনিটে গর্ডনের বাকানো ক্রসে নিখুঁত হেড দেন কেইন। এই গোলে কিংবদন্তি পেলের ১২ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন তিনি। ১১ মিনিট পর তাকেও ছাড়িয়ে যান অসাধারণ, অনবদ্য গোলে।
বক্সের সামান্য বাইরে গর্ডনের কাছ থেকে বল পেয়ে ভেতরে ঢুকে দুই ডিফেন্ডারকে পাশে রেখে ড্রিবলিং করেন। এরপর জায়গা পানিয়ে জোরাল শট নেন। বল খুঁজে নেয় জাল। এবারের আসরে নিজের পঞ্চম গোল করে গোল্ডেন বুট পাওয়ার লড়াইয়ে নিজেকে আরও একধাপ এগিয়ে নেন থ্রি লায়ন্সের অধিনায়ক।
পিছিয়ে থেকে ইংল্যান্ডের জয়ের রেকর্ড খুব কম। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ জিতেছিল ইংল্যান্ড। এরপর দীর্ঘ ৬০ বছর কেটে গেলেও বিশ্বকাপে প্রথমে গোল হজম করার পর আর কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি তারা। কেইন আজকের রাতে শুধু ইতিহাসই পাল্টায়নি। বরং অক্ষয় কালিতে লিখেছেন নতুন কিছু।
প্রি কোয়ার্টারে ৬ জুলাই তাদের প্রতিপক্ষ।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: