ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক, সেই দলের বিরুদ্ধে কী জ্বলে উঠতে পারবেন মেসি
আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ১ নম্বর দলের মুখোমুখি যখন ২১ নম্বর দল, তখন ফেভারিট কারা?
কাগজ-কলমের হিসাব বলছে, উত্তরটা খুব সহজ। আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফুটবল তো শুধু র্যাঙ্কিংয়ের খেলা নয়। ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে অনেক সময় পরিসংখ্যান, অতীত ইতিহাস কিংবা শক্তির পার্থক্য সবকিছুকেই মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে পারে। আর সে কারণেই অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি নিয়ে আগ্রহও কম নয়।
তবে শুরুতেই বলে রাখা ভালো, অস্ট্রিয়া যদি সত্যিই আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেয়, তাহলে সেটি হবে এই বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন। এমন ফলাফল শুধু টুর্নামেন্টের গতিপথই বদলে দেবে না, বিশ্ব ফুটবলেও বড় আলোচনার জন্ম দেবে।
আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়ার লড়াইয়ের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। দু’দল মুখোমুখি হয়েছে মাত্র দু’বার। এর মধ্যে ১৯৮৯ সালের ম্যাচটি আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ সেই ম্যাচেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একমাত্র হ্যাটট্রিক করেছিলেন দিয়াগো ম্যারাডোনা। ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতেছিল ৫-১ গোলে। এর আগে ১৯৮২ সালে দু’দলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল, যে ম্যাচটি শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়।
অতীতের পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার পক্ষেই কথা বলছে। দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর বিপক্ষে অস্ট্রিয়ার রেকর্ড খুব একটা উজ্জ্বল নয়। ১৯৮২ বিশ্বকাপে চিলির বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ের পর দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আরও ১০টি ম্যাচ খেলেছে অস্ট্রিয়া। এর মধ্যে মাত্র একটি ম্যাচে জয় পেয়েছে তারা, সেটিও ২০১৭ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে।
অন্যদিকে ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক রেকর্ড বেশ শক্তিশালী। ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হারার পর গ্রুপ পর্বে ইউরোপের দলগুলোর বিপক্ষে আটটি ম্যাচ খেলেছে আর্জেন্টিনা, যার একটিতেও হারেনি তারা। ফলে ইতিহাস, পরিসংখ্যান এবং সাম্প্রতিক ফর্ম সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্টিনাকেই এগিয়ে রাখতে হচ্ছে।
তবে মাঠের খেলা কখনোই শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ম্যাচের ফল নির্ভর করে কৌশল, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং মুহূর্তের সিদ্ধান্তের ওপর। আর সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন দু’দলের কোচ।
অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিক আধুনিক ফুটবলে উচ্চ-চাপের প্রেসিং ফুটবলের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। ‘গেগেনপ্রেসিং’ দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা তিনি। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে দ্রুত বল কেড়ে নেয়া, অবিরাম চাপ সৃষ্টি করা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার দর্শনেই বিশ্বাস করেন রাংনিক। ফলে আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও অস্ট্রিয়ার কাছ থেকে একই ধরনের আগ্রাসী ফুটবল প্রত্যাশিত।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা প্রায় অসম্ভব। কারণ প্রয়োজন অনুযায়ী দল ও কৌশল বদলে ফেলার দক্ষতা তার অন্যতম বড় শক্তি। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চেও টানা কয়েকটি ম্যাচে ভিন্ন ভিন্ন ফরমেশন ব্যবহার করার নজির রয়েছে তার। ফলে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ঠিক কোন ছকে খেলবে, তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন।
তবে অস্ট্রিয়ার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স স্কালোনিকে ভাবাচ্ছে বলেই মনে হয়। শেষ ১২ ম্যাচের ১০টিতে জয় পেয়েছে দলটি। টানা চার ম্যাচ জয়ের ধারাও রয়েছে তাদের। বিশেষ করে মাঝমাঠে কনরাড লাইমার ও নিকোলাস সেওয়াল্ডের সমন্বয় অস্ট্রিয়ার অন্যতম বড় শক্তি। দুজনই পরিশ্রমী, শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং প্রেসিং ফুটবলে অত্যন্ত কার্যকর।
সেই কারণে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ ও রদ্রিগো ডি পলকে কী ভূমিকায় ব্যবহার করা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন হলে আরও শারীরিকভাবে শক্তিশালী কোনো খেলোয়াড়কে দলে নেয়ার কথাও ভাবতে পারেন স্কালোনি।
অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগেও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম ম্যাচে চোয়ালে আঘাত পাওয়া ডিফেন্ডার স্টেফান পসচ পুরোপুরি সুস্থ নন। বিশেষ সুরক্ষা মাস্ক পরে অনুশীলন করতে হয়েছে তাকে। তিনি খেলতে না পারলে লাইমারকে রাইট-ব্যাক হিসেবে নামানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে এই ভূমিকায় খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
মাঝমাঠে নিকোলাস সেওয়াল্ড এবং আরবি লাইপজিগে খেলা তার সতীর্থদের বোঝাপড়া, পাশাপাশি মার্সেল সাবিৎসারের বহুমুখী দক্ষতা, আর্জেন্টিনার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সাবিৎসার একদিকে যেমন প্রেসিংয়ে কার্যকর, অন্যদিকে আক্রমণ গঠন এবং মাঝমাঠে প্রয়োজনীয় ‘ডার্টি ওয়ার্ক’ করতেও পারদর্শী।
তবে আর্জেন্টিনারও শক্তির অভাব নেই। গত ম্যাচে স্কালোনির দল রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলার দারুণ উদাহরণ দেখিয়েছে। দুই উইং-ব্যাককে খুব বেশি ওপরে না তুলে মাঝমাঠে ৪-৪-২ কাঠামো তৈরি করে প্রতিপক্ষকে আটকে রেখেছিল তারা। প্রতিপক্ষ ছয়টি শট নিলেও একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। কেবল একটি মুহূর্তের ভুল থেকেই গোল হজম করতে হয়েছিল।
রক্ষণভাগে নাহুয়েল মোলিনা ও গঞ্জালো মন্টিয়েলের মধ্যে কে শুরু করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে বাম পাশে মেদিনা এবং মাঝখানে রোমেরো ও মার্টিনেজের জুটি থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
সবকিছু মিলিয়ে কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনার শক্তি অস্ট্রিয়ার চেয়ে বেশি। শুধু জয় নয়, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে দাপটের সঙ্গে জেতার সামর্থ্যও রয়েছে তাদের। তবে সেই সামর্থ্য মাঠে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, সেটিই দেখার বিষয়।
আর আর্জেন্টিনার কথা বলতে গেলে শেষ পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন একজনই লিওনেল মেসি। প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছেন কি না, সেটি বড় কথা নয়। আর্জেন্টিনার আক্রমণে তার প্রভাবই আসল বিষয়। দলের নেয়া নয়টি শটের মধ্যে আটটিতেই ছিল তার সরাসরি অবদান। ছয়টি শট নিজে নিয়েছেন, দুটি সুযোগ তৈরি করেছেন সতীর্থদের জন্য।
৩৯ বছর বয়সে এসে যেখানে অধিকাংশ ফুটবলারের ক্যারিয়ার শেষের পথে, সেখানে মেসি এখনো পুরো ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কখন, কোথা থেকে, কীভাবে তিনি একটি পাস দেবেন বা একটি আক্রমণ তৈরি করবেন সেটি অনেক সময় প্রতিপক্ষ তো দূরের কথা, দর্শকরাও বুঝে উঠতে পারেন না।
তাই অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার কৌশল, মাঝমাঠের লড়াই কিংবা রক্ষণভাগের পরিকল্পনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ মেসির উপস্থিতি। কারণ তিনি এমন একজন ফুটবলার, যাকে শুধু বিশ্লেষণ নয়, উপভোগও করতে হয়।
আর সেই কারণেই ফুটবলপ্রেমীরা, যে দলেরই সমর্থক হোন না কেন, চাইবেন মেসি ভালো খেলুন। কারণ তার সেরা ফুটবল মানেই বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একটি স্মরণীয় রাত।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: