মেসি-রোনালদো দ্বৈরথের পথ বদলে দিলো কলম্বিয়া-পর্তুগাল ম্যাচ
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সম্ভাবনাগুলোর একটি ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আরেকটি মুখোমুখি লড়াই।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবল বিশ্বকে শাসন করা এই দুই মহাতারকার শেষ বিশ্বকাপ হিসেবে ধরা হচ্ছে এবারের আসরকে। ফলে টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে তাদের সম্ভাব্য দ্বৈরথ ঘিরে ছিল ব্যাপক উন্মাদনা। কিন্তু গ্রুপ পর্বের এক নাটকীয় ফলাফল সেই স্বপ্নের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এখন মেসি ও রোনালদোর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বেঁচে আছে শুধুমাত্র বিশ্বকাপের ফাইনালে।
রোববার (২৮ জুন) মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল কলম্বিয়া ও পর্তুগাল। ম্যাচজুড়ে দুই দলই ছিল সতর্ক, আর প্রতিটি আক্রমণেই ছিল বাড়তি চাপের ছাপ। নির্ধারিত সময়ের শেষ দিকে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার ডেভিনসন সানচেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেন। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন উৎসবের আবহ তৈরি হয়। তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির সহায়তায় গোলটি পুনরায় পরীক্ষা করা হলে দেখা যায়, বল জালে পাঠানোর মুহূর্তে সানচেজের পায়ের আঙুল প্রতিপক্ষের শেষ ডিফেন্ডারের চেয়ে সামান্য এগিয়ে ছিল। কয়েক মিলিমিটারের সেই ব্যবধানই অফসাইড হিসেবে গণ্য হয় এবং গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয়।
এই ড্রয়ের ফলে কলম্বিয়া গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে, আর পর্তুগালকে সন্তুষ্ট থাকতে হয় রানার্সআপ হয়ে। তবে এই ফলাফলের প্রভাব ছিল আরও বড়। গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ায় পর্তুগাল চলে যায় আর্জেন্টিনার বিপরীত ব্র্যাকেটে। ফলে নকআউট পর্বের কোনো পর্যায়েই মেসি ও রোনালদোর মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ থাকছে না, যদি না দুই দল নিজেদের সব বাধা অতিক্রম করে ফাইনালে পৌঁছাতে পারে।
ফুটবলপ্রেমীদের হতাশার কারণ আরও একটি। টুর্নামেন্টের ড্র অনুযায়ী, পর্তুগাল যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারত এবং আর্জেন্টিনাও নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থান ধরে রেখে নকআউটে উঠত, তাহলে কোয়ার্টার ফাইনালেই দেখা যেতে পারত ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীক্ষিত এই দ্বৈরথ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক দিন ধরেই সেই সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। কিন্তু একটি ড্র এবং একটি বাতিল গোল পুরো দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে।
এদিকে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বে ছিল দুর্দান্ত ছন্দে। আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে খেলতে লিওনেল মেসি একাই পাঁচ গোল করেন এবং দলকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটে তোলেন। পরে জর্ডানের বিপক্ষেও গোল করে তিনি আরেকটি অনন্য কীর্তি গড়েন। টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার মাধ্যমে তিনি গড়েন নতুন এক বিশ্বরেকর্ড।
অন্যদিকে, পর্তুগালের জন্য নকআউট পর্বের পথ মোটেও সহজ নয়। শেষ ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া। সেই ম্যাচে জয় পেলে পরের রাউন্ডে অপেক্ষা করতে পারে শক্তিশালী স্পেন। আর্জেন্টিনার পথ তুলনামূলক সহজ মনে হলেও বিশ্বকাপের নকআউটে কোনো প্রতিপক্ষকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
গ্রুপের আরেক ম্যাচে চমক দেখিয়েছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। উজবেকিস্তানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তারা শুধু নিজেদের অবস্থানই শক্ত করেনি, একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার শেষ ৩২-এ ওঠার সম্ভাবনাও শেষ করে দিয়েছে। নকআউট পর্বে ডিআর কঙ্গোকে এখন লড়তে হবে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
মেসি ও রোনালদোর দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস ফুটবলকে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব মিলিয়ে ৩৬টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছেন তারা। এর মধ্যে ১৬ বার জয় পেয়েছেন মেসি এবং করেছেন ২২ গোল। রোনালদোর ঝুলিতে রয়েছে ১১টি জয় ও ২১ গোল। পরিসংখ্যান যা-ই বলুক, ফুটবল ইতিহাসে তাদের দ্বৈরথকে অনেকেই সর্বকালের সেরা ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে বিবেচনা করেন।
দুজনই এখন ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে। ২০৩০ বিশ্বকাপে তাদের খেলার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের আরেকবার মুখোমুখি দেখার স্বপ্নও ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। তবুও আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি; বরং নাটকীয়ভাবে সেটি আরও বড় এক মঞ্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখন বিশ্ব ফুটবলের কোটি কোটি সমর্থকের চোখ নকআউট পর্বের দিকে। আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল যদি নিজেদের পথের সব বাধা অতিক্রম করতে পারে, তাহলে বিশ্বকাপের ফাইনালেই হতে পারে মেসি ও রোনালদোর বহুল প্রতীক্ষিত ‘লাস্ট ড্যান্স’। ফুটবল ইতিহাসের দুই মহাতারকার শেষ বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়ে এমন একটি স্বপ্নের ফাইনালের অপেক্ষায় রয়েছে গোটা ফুটবল বিশ্ব। তবে ফুটবল সব সময় রূপকথার মতো এগোয় না। তাই সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তার উত্তর লুকিয়ে আছে সামনে অপেক্ষা করা নকআউট লড়াইগুলোতে।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: