৪৮ দলের বিশ্বকাপ নেমে এলো ৩২ এ
বিশ্বকাপের আসল লড়াই এখন শুরু হতে যাচ্ছে। তবে নকআউট পর্বের উত্তেজনায় ডুবে যাওয়ার আগে ফিরে তাকানো যায় সদ্য শেষ হওয়া গ্রুপ পর্বের দিকে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে রেকর্ড, নাটকীয়তা, গোলবন্যা ও নানা বিস্ময়কর পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে।
আর্জেন্টিনা-জর্ডান ও আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়ার ম্যাচ দিয়ে শেষ হয়েছে গ্রুপ পর্বের লড়াই। এখন ৩২টি দলকে নিয়ে শুরু হবে নকআউট পর্ব, যেখানে প্রতিটি ম্যাচই ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই।
সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের প্রথম অধ্যায়
এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ৪৮ দলের আসর। নতুন ফরম্যাটে মোট ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০৪। এর মধ্যে গ্রুপ পর্বেই অনুষ্ঠিত হয়েছে ৭২টি ম্যাচ। প্রতিটি দল খেলেছে তিনটি করে ম্যাচ।
বড় পরিসরের এই আসর শুরু থেকেই উপহার দিয়েছে অপ্রত্যাশিত ফল, দর্শক-উন্মাদনা এবং রেকর্ড ভাঙা পারফরম্যান্স। গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় একটি আসর হয়ে উঠতে পারে।
১৬ দলের বিদায়, টিকে আছে ৩২
গ্রুপ পর্ব শেষে বিদায় নিয়েছে ১৬টি দল। অন্যদিকে শেষ ষোলো নয়, এবার সরাসরি ৩২ দল নিয়ে শুরু হচ্ছে নকআউট পর্ব। এখন থেকে শিরোপার পথে কোনো দ্বিতীয় সুযোগ নেই। টানা পাঁচটি ম্যাচ জিততে পারলেই মিলবে বিশ্বকাপের ট্রফি। কে শেষ পর্যন্ত সেই গন্তব্যে পৌঁছাবে, তার উত্তর মিলবে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে।
গোলের রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস
গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়গুলোর একটি গোলসংখ্যা। ৭২ ম্যাচে মোট গোল হয়েছে ২১৫টি, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে গ্রুপ পর্ব শেষে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্ট মিলিয়ে হয়েছিল ১৭২ গোল। এবার সেই সংখ্যাকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে দলগুলো। আক্রমণাত্মক ফুটবল, দ্রুতগতির খেলা এবং তুলনামূলক উন্মুক্ত কৌশল সব মিলিয়ে গোলবন্যার বিশ্বকাপ দেখছে ফুটবল বিশ্ব।
আরও একটি পরিসংখ্যান বিশেষভাবে নজর কাড়ে। অংশ নেয়া ৪৮ দলের মধ্যে ৪৭টিই গোল করতে পেরেছে। একমাত্র পানামা তিন ম্যাচ খেলেও গোলের দেখা পায়নি।
গোলে এগিয়ে ইউরোপের শক্তিগুলো
দলগত গোলসংখ্যার তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছে জার্মানি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস। তিন দলই করেছে ১০টি করে গোল। তাদের কাছাকাছি আছে আর্জেন্টিনা, যারা করেছে ৮ গোল। ব্রাজিলের গোলসংখ্যা ৭। নকআউট পর্বে এই দলগুলোর আক্রমণভাগের দিকে বিশেষ নজর থাকবেই।
কার্ডের হিসাবেও উত্তাপ কম ছিল না
গ্রুপ পর্বে শুধু গোলই হয়নি, মাঠে উত্তেজনাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ৭২ ম্যাচে রেফারিরা দেখিয়েছেন মোট ১৬৩টি হলুদ কার্ড। সবচেয়ে বেশি হলুদ কার্ড দেখেছেন প্যারাগুয়ে, কুরাসাও ও হাইতির খেলোয়াড়েরা। তিন দলেরই সাতজন করে ফুটবলার কার্ড পেয়েছেন।
ব্রাজিলের পাঁচজন এবং আর্জেন্টিনার দুজন খেলোয়াড়ও হলুদ কার্ড দেখেছেন। লাল কার্ডের সংখ্যাও কম নয়। মোট ১০ জন ফুটবলার মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন লাল কার্ড দেখে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও কাতারের খেলোয়াড়েরা পেয়েছেন সর্বোচ্চ দুটি করে লাল কার্ড।
গ্যালারিতেও বিশ্বকাপ জ্বর
মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি গ্যালারিতেও ছিল উৎসবের আমেজ। দর্শক উপস্থিতির রেকর্ড গড়েছে উদ্বোধনী ম্যাচ। মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন ৮০ হাজার ৮২৪ জন দর্শক, যা গ্রুপ পর্বে সর্বোচ্চ উপস্থিতির ম্যাচ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
হ্যাটট্রিকের মঞ্চে মেসি, ডেভিড ও দেম্বেলে
গ্রুপ পর্বে এখন পর্যন্ত দেখা গেছে তিনটি হ্যাটট্রিক। প্রথমটি করেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তিনি এবারের বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকের মালিক হন।
এরপর কাতারের বিপক্ষে কানাডার জোনাথান ডেভিড নাম লেখান এই তালিকায়। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে। নরওয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে একাই তিন গোল করেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। সেই হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে মেসি
ব্যক্তিগত অর্জনের লড়াইটাও জমে উঠেছে। গ্রুপ পর্ব শেষে ৬ গোল নিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন লিওনেল মেসি। তার পেছনে ৪ গোল করে আছেন আর্লিং হালান্ড, কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
নকআউট পর্বে তাদের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করতে পারে গোল্ডেন বুটের ভাগ্য।
গ্রুপ পর্ব শেষে ক্লিন শিটের কীর্তি গড়েছে মাত্র তিনটি দল। প্রতিপক্ষকে একটিও গোলের সুযোগ না দিয়ে তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে স্পেন, মেক্সিকো ও সেনেগাল।
আত্মঘাতী গোলেও রেকর্ডের ছোঁয়া
বিশ্বকাপের আরেকটি আলোচিত পরিসংখ্যান আত্মঘাতী গোল। ৭২ ম্যাচ শেষে আত্মঘাতী গোলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২। এই সংখ্যা ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যার সমান। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপেও হয়েছিল ১২টি আত্মঘাতী গোল। তবে এবার ম্যাচ সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় সেই রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
এখন নকআউটের অপেক্ষা
গ্রুপ পর্ব শেষ, কিন্তু বিশ্বকাপের গল্প এখনও অনেক বাকি। রেকর্ডভাঙা গোল, তারকাদের ঝলক, অঘটনের সম্ভাবনা আর শিরোপার স্বপ্ন সবকিছু নিয়েই এখন শুরু হচ্ছে আসল পরীক্ষা।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: