[email protected] শুক্রবার, ৩রা জুলাই ২০২৬
১৮ই আষাঢ় ১৪৩৩

২৩তম বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ৩২ রেকর্ড, মেসির দখলেই ৮টি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০২৬ ১০:০৬ এএম

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে বড় আয়োজন। ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হতেই ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে একের পর এক নতুন রেকর্ড।

ম্যাচসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গোল, দর্শক উপস্থিতি থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ও দলীয় নানা অর্জনে আগের সব আসরকে ছাড়িয়ে গেছে এবারের বিশ্বকাপ। গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই তৈরি হয়েছে অন্তত ৩২টি নতুন রেকর্ড। এর মধ্যে একাই আটটি রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি।

সম্ভবত ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা মেসি এবারও আলো ছড়াচ্ছেন আগের মতোই। গ্রুপ পর্বে ছয় গোল করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ এ, যা এখন টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ২৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা, ১৯টি ম্যাচে জয় এবং মোট ২ হাজার ৪৯০ মিনিট মাঠে থাকার রেকর্ডও এখন তার দখলে।

শুধু গোল নয়, ধারাবাহিকতাতেও নতুন ইতিহাস গড়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। টানা সাতটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে তিনি ব্রাজিলের জাইরজিনহো ও ফ্রান্সের জুস্ত ফন্টেইনের রেকর্ড ভেঙেছেন। পাশাপাশি গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে বিশ্বকাপে তার অবদান এখন ২৭টি গোলে। এর মধ্য দিয়ে পেলের ২১টি গোলে অবদান রাখার দীর্ঘদিনের রেকর্ডও পেছনে ফেলেছেন তিনি।

তবে সব অর্জনের মাঝেও একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও যুক্ত হয়েছে মেসির নামের পাশে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি তিনটি পেনাল্টি মিস করা খেলোয়াড়ও এখন তিনিই।

মেসির পাশাপাশি নতুন ইতিহাস গড়েছেন পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দুজনই বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে মাঠে নামার কীর্তি গড়েছেন। যদিও মেক্সিকোর গোলরক্ষক গুইলারমো ওচোয়া ছয়টি বিশ্বকাপ দলে থাকলেও দুটি আসরে মাঠে নামার সুযোগ পাননি। রোনালদো আরও একটি অনন্য রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন। টানা ছয়টি বিশ্বকাপেই গোল করা প্রথম ফুটবলার এখন তিনি। ৪১ বছর বয়সে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী গোলদাতার তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন পর্তুগিজ তারকা।

অভিজ্ঞদের দাপটও ছিল এবারের গ্রুপ পর্বে। ৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে অ্যাসিস্ট করার রেকর্ড গড়েছেন। ঘানার বিপক্ষে নিকোলা ভ্লাসিচের জয়সূচক গোলে কর্নার থেকে বল বাড়িয়েছিলেন তিনিই।

ইংল্যান্ডের জর্ডান হেন্ডারসনও জায়গা করে নিয়েছেন রেকর্ড বইয়ে। পানামার বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে তিনি ইংল্যান্ডের প্রথম ফুটবলার হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ এবং সাতটি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নেয়ার কীর্তি গড়েন।

কোচদের মধ্যেও রেকর্ডের ছড়াছড়ি ছিল। নরওয়ের বিপক্ষে জয় এনে দিয়ে ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোচ হিসেবে সর্বোচ্চ ১৭ ম্যাচ জয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছেন। একই সঙ্গে একই দলের হয়ে টানা চারটি বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করে ইংল্যান্ডের ওয়াল্টার উইন্টারবটম ও পশ্চিম জার্মানির হেলমুট শনের পাশে নাম লিখিয়েছেন তিনি।

ইরানের কোচ কার্লোস কুইরোজও বোরা মিলুতিনোভিচের সঙ্গে যৌথভাবে পাঁচটি বিশ্বকাপে কোচিং করানোর রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। অন্যদিকে, কুরাসাওয়ের কোচ ডিক অ্যাডভোকাত ৭৮ বছর ২৭১ দিন বয়সে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবীণ কোচ হিসেবে ম্যাচ পরিচালনা করেন। দক্ষিণ আফ্রিকার হুগো ব্রোসও ৭৪ বছর ৭৫ দিন বয়সে দলকে জিতিয়ে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক জয়ী কোচের রেকর্ড গড়েছেন।

রেকর্ডটা এবার শুধুই মেসির
গোলপোস্টের নিচেও দেখা গেছে একের পর এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া ৪০ বছর পার হওয়ার পর বিশ্বকাপে একাধিক ক্লিন শিট রাখা মাত্র তৃতীয় গোলকিপার হয়েছেন। একই সঙ্গে ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে দেশের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেকের রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।

কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুমও ইতিহাসের অংশ হয়েছেন। ইকুয়েডরের বিপক্ষে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে তিনি ১৫টি সেভ করে নতুন রেকর্ড গড়েন। অতিরিক্ত সময় ছাড়া কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে এত বেশি সেভ এর আগে দেখা যায়নি।

অন্যদিকে, স্পেনের বিপক্ষে বল হাত থেকে ফেলে গোল হজম করার মাধ্যমে উরুগুয়ের গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরা এক বিশ্বকাপে গোলকিপারের ভুলে তিন গোল হজম করার প্রথম রেকর্ড গড়েছেন। আর এবারের আসরে এখন পর্যন্ত পাঁচবার গোলকিপার বদলের ঘটনা ঘটেছে, যা ২০১৪ সালের পর এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ।

দলীয় রেকর্ডেও ছিল বিস্ময়ের ছড়াছড়ি। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের এক আসরে পাঁচ জোড়া ভাই একসঙ্গে খেলেছেন। তাদের মধ্যে ছয়জনের জন্ম নেদারল্যান্ডসে। একই সঙ্গে ব্রায়ান ব্রোবি ও ডেরিক লুকাশেন ইতিহাসের প্রথম দুই ভাই, যারা ভিন্ন দুই দেশের হয়ে বিশ্বকাপে গোল করেছেন।

কেপ ভার্দেও লিখেছে রূপকথা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ এখন তারা। শুধু তাই নয়, ১৯৯৮ সালের চিলির পর প্রথম দল হিসেবে কোনো ম্যাচ না জিতেই তিনটি ড্র করে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে কেপ ভার্দে।

ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনও নতুন ইতিহাস গড়েছেন। গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ১১ গোলের মালিক এখন তিনি। এর মধ্যে পাঁচটি এসেছে পেনাল্টি থেকে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ।

তবে একটি হতাশার রেকর্ডও গড়েছে ইংল্যান্ড। ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে ৭৮ দশমিক ৮ শতাংশ সময় বলের দখল রেখেও গোল করতে পারেনি তারা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোল না করেও এত বেশি সময় বল দখলে রাখার নজির আর নেই।

আফ্রিকার ফুটবলেও এসেছে নতুন মাইলফলক। গ্রুপ পর্বে আট গোল করে সেনেগাল বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো দলের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েছে। ইরাককে ৫-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে পাঁচ গোল করা প্রথম আফ্রিকান দলও তারা। সেনেগালের ইলিমান এনদিয়ায়ে বদলি হিসেবে নেমে একই ম্যাচে গোল, অ্যাসিস্ট, প্রতিপক্ষের বক্সে পাঁচবার বল স্পর্শ এবং পাঁচটি সফল ড্রিবলের বিরল কীর্তিও গড়েছেন।

বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকুও জায়গা করে নিয়েছেন রেকর্ডের তালিকায়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে মাত্র পাঁচবার বল স্পর্শ করেই একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। এত কম টাচে দুটি গোলে অবদান রাখার নজির বিশ্বকাপে এবারই প্রথম।

রেফারিংয়েও এসেছে নতুন মাইলফলক। ইরানি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান রেফারি আলিরেজা ফাগানি এবং আর্জেন্টিনার সহকারী রেফারি হুয়ান পাবলো বেলাত্তি দুজনই চারটি বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনা করে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন।

গ্রুপ পর্বেই এত রেকর্ডের জন্ম দেয়ার পর এখন অপেক্ষা নকআউট পর্বের। শিরোপার লড়াই যত এগোবে, ইতিহাসের খাতায় নতুন নতুন অধ্যায় যোগ হওয়ার সম্ভাবনাও ততই বাড়বে।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর