বিশ্বকাপ মাতাচ্ছে ছোট্ট এক মুসলিম জনপদের সুসংঠিত দেশ কেপ ভার্দে
বিশ্ব ফুটবলের প্রতিটি আসরই জন্ম দেয় নতুন কোনো বিস্ময়ের। এবার সেই বিস্ময়ের নাম কেপ ভার্দে। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্রটি দুর্দান্ত নৈপুণ্যে বিশ্বকাপের অন্যতম চমক হয়ে উঠেছে। মাঠের সাফল্যে মুহূর্তেই কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে দেশটি।
কয়েক দিন আগেও কেপ ভার্দে ছিল অনেকের কাছেই প্রায় অচেনা একটি নাম। অথচ এখন গুগল থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম—সবখানেই দেশটিকে নিয়ে বাড়ছে অনুসন্ধান। কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া সেই খোঁজ এখন রূপ নিয়েছে বিস্ময় আর মুগ্ধতায়। ফুটবল যেন অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্রকে।
তবে শুধু ফুটবল নয়, কেপ ভার্দে আলোচনায় এসেছে আরেকটি কারণেও। দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম অংশ হলো ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান মুসলিম সম্প্রদায়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের (ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট) আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিবেদন এবং কেপ ভার্দের জাতীয় পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যা ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৩ জন। এর মধ্যে প্রায় ২ শতাংশ মুসলিম। অর্থাৎ কেপ ভার্দেতে বর্তমানে মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার ৩৬৭।
দেশটির মুসলিমদের বড় একটি অংশ সেনেগাল ও পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে আসা অভিবাসী। জীবিকা ও ব্যবসার খোঁজে তারা ধীরে ধীরে কেপ ভার্দেতে স্থায়ী হয়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটকদের কাছে স্মারকপণ্য বিক্রি, নির্মাণশিল্প, হোটেল, পরিবহন ও হস্তশিল্প-এসব খাতেই তাদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। সংখ্যায় কম হলেও দেশের অর্থনীতিতে মুসলিমদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
সময়ের সঙ্গে কেপ ভার্দেতে মুসলিম সম্প্রদায় আরও সুসংগঠিত হয়েছে। রাজধানী প্রাইয়া ছাড়াও মিনদেলো, সাল ও বোয়া ভিস্তা দ্বীপে তাদের বসবাস বেশি। এখানকার অধিকাংশ মুসলিম সুন্নি মতাবলম্বী। পশ্চিম আফ্রিকার তিজানিয়া ও মুরিদ সুফি তরিকার প্রভাব তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
কেপ ভার্দেতে ইসলামের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর আগে, ১৫শ শতকে পর্তুগিজরা দ্বীপপুঞ্জে উপনিবেশ স্থাপনের পর সেনেগাম্বিয়া ও আপার গিনি অঞ্চল থেকে আসা মুসলিম ব্যবসায়ী ও ক্রীতদাসদের হাত ধরে সেখানে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় ওলোফ, মান্দিঙ্কা ও ফুলানি জনগোষ্ঠীর বহু মুসলিম আখের খেত ও গৃহস্থালি কাজে নিয়োজিত ছিলে।
ইতিহাসের সেই ক্ষুদ্র সূচনা আজ একটি প্রতিষ্ঠিত সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। আর বিশ্বকাপের আলোয় যখন কেপ ভার্দে নতুন করে বিশ্বের নজরে, তখন দেশটির মুসলিম সমাজও স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলের অংশ হয়ে উঠেছে। ফুটবলের এই রূপকথা তাই শুধু মাঠের সাফল্যের গল্প নয়; এটি একটি দেশের মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে নতুন করে জানারও উপলক্ষ।
ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: