[email protected] শুক্রবার, ৩রা জুলাই ২০২৬
১৮ই আষাঢ় ১৪৩৩

চিৎকারের ভিড়ে এক নীরব বিপ্লব: ফুটবল গ্যালারির ‘স্ট্যাচু ম্যান’

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৯:০৭ এএম

ডিআর কঙ্গোর ফুটবল গ্যালারিতে এক অদ্ভুত দৃশ্য এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। কোট-চশমা পরা, পরিপাটি পোশাকে এক ব্যক্তি ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই গ্যালারির এক কোণে প্রায় ৯০ মিনিট একদম স্থির দাঁড়িয়ে থাকেন।

যেন জীবন্ত ভাস্কর্য। দর্শকরা প্রথমে বিস্মিত হয়েছিলেন, পরে সেই বিস্ময় রূপ নেয় কৌতূহলে। এরপর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করেন বারবার। এই লিভিং স্ট্যাচু পরিচিত হয়েছেন মিশেল কুকা এম্বোলাদিঙ্গা নামে, যাকে অনেকে আবার ভালোবেসে ডাকেন লুমুম্বা ভেয়া নামে।

মিশেলের এই নীরব উপস্থিতি শুধু কোনো অদ্ভুত সমর্থনের ধরন নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস, রাজনীতি এবং আত্মপরিচয়ের গভীর প্রতীকী অর্থ। তিনি কঙ্গোর জাতীয় বীর প্যাট্রিস লুমুম্বার মতো পোশাক পরেন এবং একই ধরনের ভঙ্গিতে হাত উঁচু করে স্থির দাঁড়িয়ে থাকেন। তার কাছে এটি এক ধরনের ইমোশনাল স্ট্যামিনা। অর্থাৎ নিজের আবেগকে স্থির রেখে দলকে মানসিক শক্তি দেয়া।

প্যাট্রিস লুমুম্বা ছিলেন কঙ্গোর স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৬০ সালে বেলজিয়াম থেকে স্বাধীনতা লাভের পর তিনি নেতৃত্বে আসেন। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজনৈতিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জেরে তার জীবন শেষ হয়। কঙ্গোর মানুষের কাছে তিনি আজও স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

এই ঐতিহাসিক প্রতীকীকেই মাঠের গ্যালারিতে জীবন্ত করে তুলেছেন মিশেল। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি আসলে লুমুম্বার বিখ্যাত একটি মূর্তির অনুকরণ। এজন্যই তাকে লুমুম্বা ভেয়া-অর্থাৎ লুমুম্বা এখনো বেঁচে আছেন, নামে ডাকা হয়।

শুরুর দিকে অনেকেই তার এই আচরণকে অস্বাভাবিক মনে করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলে যায়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে তার স্থির, আবেগহীন উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশের সমর্থকরাও তার স্টাইল অনুকরণ করতে শুরু করেন।

মিশেলের দাবি, ম্যাচের দিন তিনি টানা ৯০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হওয়ার জন্য অন্যান্য দিনেও দীর্ঘ সময় অনুশীলন করেন। ধীরে ধীরে শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণে এনে তিনি এই নীরব সমর্থন রপ্ত করেছেন। তার বিশ্বাস, এই নীরবতা খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে শক্তি জোগায়। তবে দল হারলে তিনি নিজেও আবেগ ধরে রাখতে পারেন না।

বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব এবং বড় টুর্নামেন্টে কঙ্গোর ম্যাচগুলোতে তার উপস্থিতি এখন আলাদা গুরুত্ব পায়। এমনকি দলীয় কর্তৃপক্ষও তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে জানা যায়। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের অনুরোধে তিনি অনেক সময় দলের সঙ্গে ভ্রমণেও যুক্ত থাকেন।

দলের এই উত্থানের সঙ্গে গ্যালারিতে মিশেলের মতো প্রতীকী উপস্থিতিও যুক্ত হয়েছে আলাদা মাত্রা। সমর্থকরা মনে করেন, তিনি শুধু একজন দর্শক নন-বরং দলের মানসিক শক্তির অংশ।

তবে তার পরিচয়ের আরেকটি দিক হলো তার বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা, অনুকরণ ও বিশ্লেষণ। কেউ তাকে শিল্পের প্রতীক বলেন, কেউ আবার রাজনৈতিক বার্তার এক জীবন্ত রূপ হিসেবে দেখেন।

সব মিলিয়ে, মিশেল কুকা এম্বোলাদিঙ্গা এখন শুধু কঙ্গোর একজন সমর্থক নন; তিনি হয়ে উঠেছেন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক-যেখানে ফুটবল, ইতিহাস, প্রতিবাদ আর আবেগ এক সুতোয় বাঁধা।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর