[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ৪ঠা জুন ২০২৬
২১শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

নারী হকির সাফল্যের নেপথ্য কারিগর নান্নু ও রিয়াজুল হাসানের অদম্য যাত্রা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ২২:০৪ পিএম

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারী অংশগ্রহণ আজ আর নতুন কোনো বিষয় নয়। ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিকস—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মেয়েরা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ রেখে চলেছে। তবে এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে কিছু নিরলস পরিশ্রমী মানুষের গল্প, যাদের প্রচেষ্টা অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। তেমনি দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন তরিকুল ইসলাম নান্নু এবং বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক লে. কর্ণেল (অব.) রিয়াজুল হাসান।

বাংলাদেশে নারী হকির ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে, নানা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে এই খেলা। প্রথমবার এশিয়ান গেমস বাছাই পর্বে  অংশ নিয়্রেই বাজিমাত করেছে লাল সবুজের মেয়েরা। প্রথমবারের মতো এশিয়ান গেমসে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছে অর্পিতা পালরা। এই পথচলায় অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন তরিকুল ইসলাম নান্নু। তিনি শুধু একজন সংগঠক নন, বরং একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি বিশ্বাস করতেন—বাংলাদেশের মেয়েরাও আন্তর্জাতিক মানের হকি খেলতে পারে।

শুরুর দিকে নারী হকি নিয়ে আগ্রহ খুবই কম ছিল। অবকাঠামোর অভাব, প্রশিক্ষকের সংকট, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। অনেক পরিবারই মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণকে ভালো চোখে দেখত না। এই প্রতিকূল পরিবেশে দাঁড়িয়ে তরিকুল ইসলাম নান্নু মাঠে নামেন এক নতুন স্বপ্ন নিয়ে। তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিভাবান মেয়েদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করে তাদের উৎসাহিত করেন।

নান্নুর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ধৈর্য এবং পরিকল্পনা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নারী হকির উন্নয়ন রাতারাতি সম্ভব নয়। তাই তিনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, নিয়মিত অনুশীলন, এবং দক্ষ কোচিংয়ের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের মানোন্নয়নে কাজ করতে থাকেন। তার এই প্রচেষ্টার ফলে ধীরে ধীরে নারী হকিতে আগ্রহ বাড়তে শুরু করে।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক ও কাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন লে. কর্ণেল (অব.) রিয়াজুল হাসান। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নারী হকিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সচেষ্ট হন। তার নেতৃত্বে নারী হকির জন্য আলাদা বাজেট, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

রিয়াজুল হাসানের অন্যতম বড় অবদান হলো নারী হকিকে মূলধারায় নিয়ে আসা। আগে যেখানে নারী হকি ছিল অনেকটা উপেক্ষিত, সেখানে এখন এটি ফেডারেশনের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি খাত। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা আনার চেষ্টা করেন, যাতে বাংলাদেশের নারী খেলোয়াড়রা উন্নত প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ-সুবিধা পায়।

তরিকুল ইসলাম নান্নু ও রিয়াজুল হাসানের সমন্বিত প্রচেষ্টা নারী হকির উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একজন মাঠ পর্যায়ে কাজ করে প্রতিভা গড়ে তুলেছেন, অন্যজন সেই প্রতিভাকে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করেছেন। এই দ্বিমুখী প্রচেষ্টার ফলেই আজ বাংলাদেশের নারী হকি দল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছে।

নারী হকির এই অগ্রযাত্রায় এসেছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ভালো পারফরম্যান্স, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ, এবং খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি—সবকিছুই এই দুই সংগঠকের অবদানের ফল। বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

তবে এখনও অনেক পথ বাকি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ, এবং পেশাদার লিগ চালুর মতো বিষয়গুলোতে আরও কাজ করতে হবে। এই জায়গাগুলোতে তরিকুল ইসলাম নান্নু ও রিয়াজুল হাসান ইতোমধ্যেই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তাদের লক্ষ্য, বাংলাদেশকে নারী হকিতে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।

নারী হকির উন্নয়ন শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মেয়েদের ক্ষমতায়ন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে এই খেলার ভূমিকা অপরিসীম। আর এই পরিবর্তনের পেছনে যারা কাজ করছেন, তাদের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।

তরিকুল ইসলাম নান্নু ও লে. কর্ণেল (অব.) রিয়াজুল হাসান সেইসব নেপথ্যের কারিগর, যারা নিজেদের স্বার্থের কথা না ভেবে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, সঠিক দৃষ্টি এবং আন্তরিকতা থাকলে যে কোনো ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনা সম্ভব।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, বাংলাদেশের নারী হকির যে অগ্রগতি আমরা আজ দেখছি, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, পরিকল্পনা এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ফল। আর এই যাত্রার অগ্রনায়ক হিসেবে তরিকুল ইসলাম নান্নু ও রিয়াজুল হাসানের নাম নিঃসন্দেহে ইতিহাসে স্থান করে নেবে। তাদের হাত ধরেই হয়তো একদিন বাংলাদেশ নারী হকি বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে—এই প্রত্যাশাই এখন সবার।

ওএফ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

সম্পর্কিত খবর